পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশির গভীরে আজ আবারও অস্থিরতার ছায়া ঘনীভূত হয়েছে। প্রায় চার দশক আগে একই জলপথে যে ঘটনা বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল, সেই পুরোনো ইতিহাস যেন নতুন করে ফিরে আসছে ভিন্ন রূপে। ১৯৮৭ সালের এক রাতের অন্ধকারে সামান্য কয়েকটি সামুদ্রিক মাইন কীভাবে এক বিশাল সামরিক শক্তিকে বিপর্যস্ত করতে পারে, তা তখনই বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছিল। সেই সময় একটি বৃহৎ তেলবাহী জাহাজ মাইনের আঘাতে গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আধুনিক যুদ্ধকৌশলের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তৎকালীন সংঘাতে দেখা যায়, বিপুল ব্যয়বহুল যুদ্ধজাহাজ ও প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও অতি সাধারণ ও কম ব্যয়ের মাইনই কার্যত পুরো নৌবাহিনীকে বিপাকে ফেলে দেয়। অত্যাধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও সমুদ্রতলের অদৃশ্য বিস্ফোরক শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে যুদ্ধজাহাজগুলো নিজেদের সুরক্ষার জন্যই একে অপরের নিকটে অবস্থান নিতে বাধ্য হয়, যা সামরিক কৌশলের দিক থেকে ছিল এক বড় ব্যর্থতার ইঙ্গিত।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আবারও একই ধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে নতুন করে মাইন স্থাপনের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, পানির গভীরে বহু আধুনিক মাইন বিছানো হয়েছে, যেগুলো দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকতে সক্ষম এবং পরিবেশগত পরিবর্তন ও ক্ষুদ্র কম্পনও শনাক্ত করতে পারে।
এই ধরনের মাইনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলো শুধু ধাতব উপস্থিতি নয়, বরং জাহাজের কম্পন ও পানির চাপের সামান্য পরিবর্তনও শনাক্ত করতে সক্ষম। ফলে এগুলো সমুদ্রের স্বাভাবিক পাথর বা বালুর সঙ্গে মিশে গিয়ে প্রায় অদৃশ্য হয়ে থাকে। এ কারণে আধুনিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থাও অনেক সময় বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
বর্তমান সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে কিছু দেশের প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির ঘাটতি। পুরোনো মাইন অপসারণ সক্ষম জাহাজগুলো অবসরে পাঠানো এবং নতুন প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা পরিস্থিতিকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ব্যবস্থাগুলো এখনো পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়নি, ফলে বাস্তব পরিস্থিতিতে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
নিচের সারণিতে ১৯৮৭ ও বর্তমান পরিস্থিতির তুলনামূলক চিত্র দেওয়া হলো—
| বিষয় |
১৯৮৭ সালের পরিস্থিতি |
বর্তমান পরিস্থিতি |
| ব্যবহৃত কৌশল |
সাধারণ সামুদ্রিক মাইন |
উন্নত সেন্সরযুক্ত আধুনিক মাইন |
| শনাক্তকরণ ব্যবস্থা |
সীমিত প্রযুক্তি |
উন্নত কিন্তু পরীক্ষাধীন প্রযুক্তি |
| প্রভাব |
বড় জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত |
বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় বাধা |
| নৌচলাচল |
আংশিক ব্যাহত |
প্রায় সম্পূর্ণভাবে হ্রাসপ্রাপ্ত |
| সামরিক প্রস্তুতি |
তুলনামূলক অপরিকল্পিত |
প্রযুক্তিনির্ভর কিন্তু অনিশ্চিত |
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্রপথে এই ধরনের অদৃশ্য হুমকি শুধু সামরিক নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহনের ওপর বিশ্ব অর্থনীতির বড় অংশ নির্ভরশীল হওয়ায় সামান্য বিঘ্নও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, চার দশক আগে যে নীরব সামুদ্রিক কৌশল বিশ্বকে বিস্মিত করেছিল, তা আজ আরও উন্নত রূপে ফিরে এসে নতুন করে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
মন্তব্য