খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ই জুলাই ২০২৬, ২:৫৯ পিএম
রাজধানীতে ‘হানিট্র্যাপ’ বা রূপের ফাঁদে ফেলে ফ্ল্যাটে আটকে রেখে মারধর ও আপত্তিকর ভিডিও ধারণের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া একটি চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। এই চক্রের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
সোমবার (৬ জুলাই) রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানানো হয়। ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের উপকমিশনার তরিকুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে পুরো ঘটনার বিবরণ দেন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—মো. আনোয়ার হোসেন (৪৫), বদিউজ্জামান শাহীন (৪৫), মরিয়ম (৪৯), শাহাদাত হোসেন (৫৮) ও উর্মী বেগম (৩৯)। ডিবি পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সক্রিয় সদস্য। তারা দীর্ঘদিন ধরে সুকৌশলে বিভিন্ন মানুষকে জিম্মি করে টাকা আদায় করে আসছিলেন। এই চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। সম্প্রতি দায়ের হওয়া একটি মামলার সুনির্দিষ্ট তদন্তের সূত্র ধরে গত শুক্র ও শনিবার রাজধানীর সবুজবাগ, বাড্ডা ও খিলগাঁও এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে এই পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানকালে তাদের কাছ থেকে অপরাধে ব্যবহৃত ৯টি মুঠোফোন, একটি ওয়াকি-টকি এবং নগদ চার হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত ১৫ এপ্রিল। ডিবির কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম জানান, একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একজন ঋণ বিতরণকারী কর্মকর্তা পেশাগত কাজে রামপুরার দক্ষিণ বনশ্রীর একটি মার্কেটে যান। সেখানে এক নারী নিজেকে ঋণগ্রহীতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে তার সাথে কথা বলেন এবং সুকৌশলে ওই কর্মকর্তার ভিজিটিং কার্ড সংগ্রহ করেন।
পরবর্তী সময়ে ওই নারী কয়েক দিন ধরে মুঠোফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে কর্মকর্তার সাথে একটি আপাত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। একপর্যায়ে গত এপ্রিলের শেষ দিকে ওই নারী কর্মকর্তাটিকে বনশ্রীর একটি হাসপাতালের সামনে দেখা করার প্রস্তাব দেন। কর্মকর্তা সেখানে পৌঁছানোর পর এক নারী তাকে রিকশায় তুলে বিভিন্ন গলি ঘুরিয়ে খিলগাঁও থানা এলাকার একটি নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটে নিয়ে যান।
গোয়েন্দা পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, কর্মকর্তাটি ফ্ল্যাটে প্রবেশের কিছুক্ষণের মধ্যেই আরও চারজন ব্যক্তি সেখানে আচমকা হাজির হন। তারা ঢুকেই ওই কর্মকর্তাকে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করেন। এরপর জোরপূর্বক এক নারীকে তার সাথে দাঁড় করিয়ে আপত্তিকর অবস্থার ভিডিও ধারণ করা হয়। এখানেই শেষ নয়, চক্রের সদস্যরা তার মুঠোফোন, মানিব্যাগ, নগদ অর্থ, ব্যাংকের এটিএম কার্ড, জাতীয় পরিচয়পত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশনসহ সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র জোর করে ছিনিয়ে নেয়।
পরবর্তী সময়ে ধারণ করা এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে চক্রটি ভুক্তভোগীর কাছে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। সম্মান বাঁচানোর তাগিদে তাৎক্ষণিকভাবে ভুক্তভোগী তার ব্যাংক হিসাব ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের (এমএফএস) মাধ্যমে মোট ১ লাখ ১০ হাজার টাকা তাদের প্রদান করেন। এরপরও বিভিন্ন সময় তাকে ব্লাকমেইল করে আরও টাকা দাবি করা হতে থাকে। একপর্যায়ে নিরুপায় হয়ে গত ২২ জুন খিলগাঁও থানায় একটি লিখিত মামলা দায়ের করেন ওই কর্মকর্তা।
ডিবির কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছি যে, এই ভুক্তভোগী একাই নন; বরং আরও একাধিক ব্যক্তিকে একই কৌশলে ফাঁদে ফেলে চক্রটি লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তাদের মোবাইল ফোনগুলোতে এই সংক্রান্ত নানান অপরাধের আলামত পাওয়া গেছে।”
ডিবি পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া এই পাঁচ সদস্যকে আদালতের মাধ্যমে পুলিশি রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। খিলগাঁও থানায় দায়ের করা মামলার ঘটনার পাশাপাশি এই চক্রের সাথে আর কারা জড়িত এবং তারা এখন পর্যন্ত কতজনের কাছ থেকে এভাবে টাকা আত্মসাৎ করেছে, তা জানার জন্য তদন্ত প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
মন্তব্য