হু হু করে বাড়ছে যমুনার পানি, সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা

টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলে সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে হু হু করে বাড়ছে যমুনা নদীর পানি। যমুনার পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে নদীটির অববাহিকায় গড়ে ওঠা বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল ও দুর্গম দ্বীপচরের নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হতে শুরু করেছে। আকস্মিকভাবে এই পানি বাড়ার ফলে নদী তীরবর্তী ও চরের লাখো বাসিন্দার মনে তীব্র বন্যা ও সর্বগ্রাসী নদীভাঙনের নতুন আতঙ্ক দানা বাঁধছে।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (১৩ জুলাই ২০২৬) সকাল থেকে যমুনা নদীর পানি আশঙ্কাজনক গতিতে বাড়ছে। পানি ক্রমাগত বাড়তে থাকায় ইতিমধ্যেই চরাঞ্চলের নিচু এলাকার ফসলি জমি ও নদী তীরবর্তী ঘরবাড়ির আশপাশে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। বিশেষ করে চলতি মৌসুমের আমনের বীজতলা ও কৃষকদের হাড়ভাঙা খাটুনিতে বোনা কাঁচা শাকসবজির ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় চাষিরা। হঠাৎ করেই ফসলের এই ক্ষতি কৃষকদের চরম অর্থনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

যমুনার বুক চিরে জেগে ওঠা নতুন মাইজবাড়ী চরের বাসিন্দা আলমগীর হোসেন নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, যেভাবে পানি বাড়ছে, তাতে আমরা গভীর আতঙ্কে রাত কাটাচ্ছি। এক রাতের মধ্যে নদীর পানি এতটা বাড়তে আগে কখনো দেখিনি। আমাদের ফসলি জমি তো ইতিমধ্যেই ডুবে গেছে, এখন ঘরের ভিটায়ও পানি ছুঁই ছুঁই করছে। পানির এই তীব্র গতি যদি অব্যাহত থাকে, তবে রাতের মধ্যেই আমাদের পুরো এলাকা তলিয়ে গৃহহীন হয়ে পড়তে হবে।

যমুনা নদীবেষ্টিত এই উপজেলায় বন্যা আর নদীভাঙনকে চরাঞ্চলের মানুষের চিরস্থায়ী অভিশাপ বলে মনে করেন স্থানীয় অধিকারকর্মীরা। তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দুর্যোগের তীব্রতা দিন দিন বাড়ছে। চরের বাসিন্দা হালিম মিয়ার কণ্ঠেও ঝরল সেই দুঃখের সুর। তিনি বলেন, একদিকে বন্যা, অন্যদিকে সর্বগ্রাসী নদীভাঙন—এই দুই দুর্যোগে চরাঞ্চলের মানুষকে প্রতিবছর চরম মানবিক সংকটে পড়তে হয়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের রাষ্ট্র দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে। অথচ আমাদের দেশের মানুষ ভিটেমাটি ও সর্বস্ব হারানোর পরও অনেক সময় প্রশাসন তাদের সঠিক খোঁজ নেয় না। তিনি চরাঞ্চলের এই অসহায় মানুষের সহায়তায় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে চাইলে কাজিপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে জিআর চাল, নগদ অর্থ এবং পর্যাপ্ত শুকনো খাবারের প্যাকেট মজুত রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি খারাপ হলে দ্রুতই এসব ত্রাণ চরাঞ্চলের দুর্গত মানুষের মাঝে বিতরণ শুরু হবে।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে জানান, উজানে ভারতের অংশে ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের কারণেই মূলত যমুনা নদীর পানি বাড়ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে ও সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভাঙনপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পাউবোর বিশেষ নজরদারি রয়েছে এবং জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে জিও ব্যাগসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।