রোববার (১ নভেম্বর) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার সলিমগঞ্জ এলাকায় নদীতে ভাসমান অবস্থায় শ্যামলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগে গত শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) পণ্য সরবরাহের কাজে বের হওয়ার পর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের পাশাপাশি চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
নিহত শ্যামল চন্দ্র দাস নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার আমিরগঞ্জ ইউনিয়নের রহিমাবাদ গ্রামের বাসিন্দা। তিনি প্রমোদ দাসের ছেলে। পেশাগত দায়িত্বের অংশ হিসেবে নৌকায় করে নেসলে ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির বিভিন্ন পণ্য রায়পুরার আলোকবালি, বটতলী ও চর-আড়ালিয়া এলাকার দোকানগুলোতে সরবরাহ করতেন।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিনের মতো গত শুক্রবারও পণ্য সরবরাহের উদ্দেশ্যে আলোকবালি এলাকায় যান শ্যামল। সেখানে যাতায়াতের জন্য তিনি জহিরুল নামের এক নৌকার মাঝির সহায়তা নেন। দুপুরে বিভিন্ন দোকানে পণ্য সরবরাহ শেষ করে বাড়ি ফেরার জন্য আবারও জহিরুলের নৌকায় ওঠেন তিনি।
তবে ফেরার পথে ঘটে বিপত্তি। অভিযোগ অনুযায়ী, জহিরুল নির্ধারিত পথ অনুসরণ না করে নৌকাটি অন্যদিকে চালাতে শুরু করেন। বিষয়টি নিয়ে শ্যামল জানতে চাইলে মাঝি তাকে আশ্বস্ত করে বলেন, এই পথে গেলে দ্রুত বাড়ি পৌঁছানো যাবে। কিন্তু নৌকাটি ক্রমেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার সলিমগঞ্জ এলাকার দিকে এগোতে থাকে।
একপর্যায়ে অন্য একটি নৌকার কাছে গিয়ে জহিরুল শ্যামলকে সেটিতে উঠতে বলেন। দ্রুত বাড়ি পৌঁছানোর সুবিধার কথা বলে তাকে ওই নৌকায় তুলে দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, আগে থেকেই পরিকল্পনা করে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে শ্যামলকে ডাকাত দলের সদস্যদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন জহিরুল। তবে ওই সময় শ্যামল বিষয়টি বুঝতে পারেননি।
অন্য নৌকায় ওঠার পরপরই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ডাকাত দলের সদস্যরা শ্যামলকে বেধড়ক মারধর করে। একপর্যায়ে তার কাছে থাকা নেসলে কোম্পানির পণ্য বিক্রির লক্ষাধিক টাকা ছিনিয়ে নেয় তারা। এতে গুরুতর আহত হন শ্যামল।
এরপর অপরাধীরা শ্যামলের মোবাইল ফোন ব্যবহার করে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। নিজেদের পুলিশের সদস্য পরিচয় দিয়ে তারা জানায়, শ্যামল গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এবং তার চিকিৎসার জন্য রক্তের প্রয়োজন। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত ২৫ হাজার টাকা পাঠানোর কথা বলা হয়। স্বজনেরা ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাই করতে না পেরে তাদের কথামতো টাকা পাঠিয়ে দেন।
টাকা পাঠানোর পরও শ্যামলের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। বারবার তার মোবাইল ফোনে কল করেও কোনো সাড়া পাননি স্বজনেরা। এতে তাদের সন্দেহ বাড়তে থাকে। পরে নৌকার মাঝি জহিরুলকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি শ্যামলকে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে অন্য নৌকার মাঝিদের হাতে তুলে দেওয়ার কথা স্বীকার করেন বলে জানা গেছে।
এদিকে, শ্যামলের সন্ধান না পেয়ে উদ্বিগ্ন পরিবারের সদস্যরা তার খোঁজখবর নিতে থাকেন। এর মধ্যেই রোববার সলিমগঞ্জ এলাকায় নদীতে একটি মরদেহ ভাসতে দেখার খবর পান তারা। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। স্বজনেরা মরদেহটি শ্যামল চন্দ্র দাসের বলে শনাক্ত করেন।
সলিমগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা মরদেহ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠান। ময়নাতদন্তের আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহ রায়পুরার রহিমাবাদ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ঘটনাটি নদীপথে পণ্য পরিবহনের নিরাপত্তা এবং কর্মীদের সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার দোকানে পণ্য সরবরাহের কাজে নিয়োজিত কর্মীদের যাতায়াত ও অর্থ বহনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একই সঙ্গে পুলিশের পরিচয় ব্যবহার করে পরিবারের কাছ থেকে টাকা আদায়ের অভিযোগটি প্রতারণার একটি গুরুতর দিক সামনে এনেছে। স্বজনদের দাবি অনুযায়ী, শ্যামলকে অপহরণ, মারধর, অর্থ ছিনতাই এবং পরে হত্যার সঙ্গে একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারে। তবে ঘটনার প্রতিটি অভিযোগের সত্যতা, হত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ এবং জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।


