খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার দমদম বিমানবন্দরের প্রাচীরসংলগ্ন প্রায় ১৩৬ বছরের পুরোনো বাঁকড়া মসজিদে জুমার নামাজ আদায়ের ঘোষণা দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত সেখানে যেতে পারেননি মুসল্লি ও মসজিদ পরিচালনা কমিটির নেতারা। শুক্রবার সকাল থেকেই গোটা এলাকায় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (বিএনএসএস)-এর ১৬৩ ধারা জারি থাকায় নির্ধারিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
সকালের প্রথম প্রহর থেকেই বিমানবন্দরের ৭ নম্বর গেট ও আশপাশের এলাকায় পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ, কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী, র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (র্যাফ) এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্যদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। নিরাপত্তার অংশ হিসেবে জলকামানও প্রস্তুত রাখা হয়। বিধাননগর পুলিশ পুরো এলাকা ঘিরে রাখায় সেখানে কোনো ধরনের জমায়েত বা প্রতিবাদ কর্মসূচি গড়ে ওঠেনি।
এর আগে বৃহস্পতিবার মসজিদ কমিটির সভাপতি, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মন্ত্রী এবং জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের রাজ্য সভাপতি সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, শুক্রবার বাঁকড়া মসজিদে জুমার নামাজ আদায়ের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ দোয়া ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হবে। তবে শুক্রবার বিমানবন্দরের ৭ নম্বর গেট এলাকায় পৌঁছে প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা শেষে তিনি জানান, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী তাঁর সমর্থকদের নিয়ে নিকটবর্তী একটি অন্য মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন। একই সময়ে কলকাতার কয়েকটি এলাকায় কিছু মুসল্লিকে হাতে কালো কাপড় বেঁধে নীরবে প্রতিবাদ জানাতে দেখা যায়। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
এই ঘটনার পেছনে রয়েছে বাঁকড়া মসজিদকে ঘিরে চলমান বিরোধ। মসজিদ কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, বিমানবন্দর সম্প্রসারণ বা সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কয়েক দিন আগে থেকেই মসজিদে প্রবেশের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে নিয়মিত নামাজ আদায়ও বন্ধ রয়েছে।
বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে মসজিদ কমিটির সদস্যরা অভিযোগ করেন, ১১ জুলাই থেকে মসজিদে যাওয়ার পথ ভেতর থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা মৌখিকভাবে জানিয়েছেন যে, বিমানবন্দরসংলগ্ন ওই মসজিদে আর নামাজ আদায়ের অনুমতি দেওয়া হবে না। তবে এ বিষয়ে তাঁদের কাছে কোনো লিখিত নির্দেশ বা সরকারি নোটিশ দেওয়া হয়নি বলেও দাবি করেন তাঁরা।
মসজিদ কমিটির বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় ১৩৬ বছরের পুরোনো এই মসজিদটি ১৮৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে স্থানীয় মুসল্লিদের পাশাপাশি দূর-দূরান্তের মানুষও এখানে নামাজ আদায় করতেন। তাঁদের দাবি, অবিভক্ত ভারতের সময় বর্তমান বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও অনেকে এই ঐতিহাসিক মসজিদে ইবাদত করতে আসতেন। সেই ঐতিহ্য হঠাৎ করেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে তাঁরা অভিযোগ তুলেছেন।
অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তাজনিত কারণে এলাকায় ১৬৩ ধারা কার্যকর রাখা হয়। ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (বিএনএসএস)-এর ১৬৩ ধারা মূলত পূর্বের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারার সমতুল্য। এই ধারার আওতায় নির্দিষ্ট এলাকায় জনসমাবেশ, মিছিল বা এমন কোনো কার্যক্রম সীমিত বা নিষিদ্ধ করা যায়, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে।
মসজিদ কমিটির প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে বাঁকড়া মসজিদে পুনরায় নিয়মিত নামাজ আদায়ের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং বিমানবন্দরের ৭ নম্বর গেট দিয়ে প্রবেশের পথ খুলে দেওয়া। এসব দাবি জানিয়ে শুক্রবার শান্তিপূর্ণভাবে জমায়েতের পরিকল্পনা থাকলেও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা ও ১৬৩ ধারা জারির কারণে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।
ঘটনার পর উত্তর ২৪ পরগনার ওই এলাকায় চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। যদিও শুক্রবার বড় ধরনের কোনো সংঘর্ষ বা সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি, তবুও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে নিরাপত্তা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। মসজিদ কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান এবং ঐতিহাসিক মসজিদটিতে স্বাভাবিকভাবে ধর্মীয় কার্যক্রম পুনরায় চালুর প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে।