সহজ শর্তে দ্রুত ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখানো ৩১টি অননুমোদিত ঋণদাতা অ্যাপ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ঋণের আবেদনকারীদের ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করে পরে হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগের কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দেওয়া এক সতর্কবার্তায় বিএফআইইউ জানায়, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপে সহজ শর্তে ও অল্প সময়ে ঋণ দেওয়ার প্রচারণা চালানো হচ্ছে। আর্থিক সংকটে থাকা মানুষ এসব প্রচারণায় আকৃষ্ট হয়ে দ্রুত ঋণ পাওয়ার আশায় নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে ফেলতে পারেন। পরে সেই তথ্য ব্যবহার করেই নানা ধরনের চাপ বা হয়রানির শিকার হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
সংস্থাটির সতর্কবার্তা অনুযায়ী, কিছু অননুমোদিত অ্যাপ ব্যবহারকারীর জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, মুঠোফোনে থাকা যোগাযোগের তালিকা, ব্যক্তিগত ছবি এবং অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। ঋণের অর্থ পরিশোধের সময় ঘনিয়ে এলে গ্রাহকের ওপর অযাচিত চাপ সৃষ্টি, পরিচিতজনদের কাছে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের হুমকি এবং ঋণের মূল অর্থের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু আর্থিক ক্ষতির কারণ নয়, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে মুঠোফোনের যোগাযোগের তালিকা বা ব্যক্তিগত ছবি অন্যের হাতে চলে গেলে তা ব্যবহার করে গ্রাহককে মানসিকভাবে চাপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনুমোদন জরুরি
বিএফআইইউ জানিয়েছে, বাংলাদেশে ঋণ প্রদান একটি নিয়ন্ত্রিত আর্থিক কার্যক্রম। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন এবং প্রচলিত আইন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো অনুসরণ ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান মোবাইল অ্যাপ, ওয়েবসাইট কিংবা অন্য কোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না।
তাই কোনো অপরিচিত অ্যাপ বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ঋণের বিজ্ঞাপন দেখলেই সেটিকে বৈধ প্রতিষ্ঠান ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে স্বাভাবিক বাজারব্যবস্থার তুলনায় অস্বাভাবিক সহজ শর্ত, খুব কম কাগজপত্রে ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি কিংবা অত্যন্ত দ্রুত টাকা দেওয়ার দাবি থাকলে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
বিএফআইইউ আরও বলেছে, অননুমোদিত ঋণ কার্যক্রমের সঙ্গে প্রতারণা, আর্থিক অপরাধ এবং মানিলন্ডারিংয়ের ঝুঁকি থাকতে পারে। ফলে ঋণের প্রয়োজন হলেও যাচাই না করে কোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনে জড়ানো উচিত নয়।
যেসব তথ্য না দেওয়ার পরামর্শ
ঋণের আবেদন করার আগে কোনো অ্যাপ কী ধরনের তথ্য চাইছে, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। বিএফআইইউ বিশেষভাবে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, ব্যাংক হিসাবসংক্রান্ত তথ্য, ব্যক্তিগত ছবি, মুঠোফোনের যোগাযোগের তালিকা এবং অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্য অপরিচিত প্ল্যাটফর্মে না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
একই সঙ্গে ঋণ পাওয়ার আগে অগ্রিম টাকা, নিবন্ধন ফি বা প্রক্রিয়াকরণ ফি দাবি করা হলে সতর্ক হতে বলা হয়েছে। কারণ দ্রুত ঋণ দেওয়ার কথা বলে আগে টাকা নেওয়া প্রতারণার একটি সম্ভাব্য লক্ষণ হতে পারে।
বিএফআইইউর সতর্কতার আওতায় থাকা ৩১টি অ্যাপ হলো—সাথী লোন, পপক্যাশ, ফিনক্যাশ, কুইক লোন, কুইক টাকা, ঢাকা ফিন, লোনভাইব, দোস্ত লোন, টাকা ক্যাশ লোন, কেওয়নজা লোন, এসএসএইচ মানি, লোনবাডি, সাথি লোন, ক্যাশহোরা, আলো ক্যাশ, ফাস্ট লোন, ইজি টাকা, ধৈর্য লোন, ফিন ডট ডু, বঙ্গক্যাশ, আশা লোন, সুবিধা লোন, স্মার্ট লোন বিডি, অনলাইন লোন বিডি, সিটি অনলাইন লোন, বিডি সহজ লোন, ক্যাশ লোন, সোনালী, লোনহাট এবং টাকানাও।
তালিকায় কাছাকাছি নামের একাধিক অ্যাপ থাকায় শুধু নাম দেখে কোনো প্ল্যাটফর্মকে বৈধ মনে না করার বিষয়েও ব্যবহারকারীদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কোনো অ্যাপ ব্যবহার করার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা ও অনুমোদন যাচাই করা জরুরি।
প্রতারণার শিকার হলে অভিযোগের সুযোগ
বিএফআইইউ জানিয়েছে, কেউ এসব অননুমোদিত প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রতারিত হলে কিংবা এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনাকারী কোনো অ্যাপ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপ, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তথ্য জানা থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করা যেতে পারে।
মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ অনুযায়ী প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই দ্রুত ঋণের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে অপরিচিত ডিজিটাল ঋণদাতার ওপর নির্ভর না করে বৈধ ও অনুমোদিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণ নেওয়ার পরামর্শই নিরাপদ।
আর্থিক সংকটের সময়ে দ্রুত টাকা পাওয়ার আশ্বাস অনেকের কাছে আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কিন্তু একটি ঋণ আবেদন করতে গিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যাংক-সংক্রান্ত বিবরণ কিংবা মুঠোফোনের নিয়ন্ত্রণ অন্যের হাতে তুলে দিলে পরবর্তী ক্ষতির মাত্রা ঋণের অঙ্কের চেয়েও বড় হতে পারে। তাই কোনো অ্যাপে তথ্য দেওয়ার আগে তার বৈধতা যাচাই এবং অস্বাভাবিক শর্ত দেখলে লেনদেন বন্ধ রাখার ওপরই জোর দিয়েছে বিএফআইইউ।


