আসন্ন বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচগুলো ভারতীয় উপমহাদেশে কোথায় এবং কোন চ্যানেলে দেখা যাবে, তা নিয়ে ক্রীড়াপ্রেমীদের মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে নানা আলোচনা ও কৌতূহল চলছিল। বিশেষ করে এই অঞ্চলের দর্শকদের জন্য সম্প্রচার স্বত্ব কে পাচ্ছে, তা নিয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। তবে ক্রীড়াপ্রেমীদের সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও উদ্বেগের অবসান ঘটিয়ে একটি নতুন তথ্য সামনে এসেছে। ভারতের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম ও সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান ‘জি নেটওয়ার্ক’ (Zee Network) আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব কিনতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানটি আনুমানিক ৩ কোটি থেকে সাড়ে ৩ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিময়ে, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৩৭০ কোটি থেকে ৪Check৩০ কোটি টাকার সমতুল্য, বিশ্বকাপের সবগুলো ম্যাচের সম্প্রচার স্বত্ব নিজেদের অনুকূলে নেওয়ার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করছে।
ফিফা এবং জি নেটওয়ার্কের মধ্যকার এই বাণিজ্যিক আলোচনা এখন একেবারে শেষ বা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে। যদি উভয় পক্ষের মধ্যকার সব শর্ত ও প্রক্রিয়া এভাবে বজায় থাকে, তবে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই এই চুক্তির বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক ও দাপ্তরিক ঘোষণা আসতে পারে। এই চুক্তির মাধ্যমে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবং জি নেটওয়ার্কের মধ্যে একটি বড় ধরণের বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
পূর্ববর্তী আলোচনা ও জি নেটওয়ার্কের সম্প্রচার পরিকল্পনা
এই সম্প্রচার স্বত্ব কেনার দৌড়ে জি নেটওয়ার্কই প্রথম প্রতিষ্ঠান ছিল না। এর আগে ভারতের বাজারে যৌথভাবে কাজ করা অন্যতম বৃহৎ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ‘রিলায়েন্স-ডিজনি’ (Reliance-Disney) ফুটবল বিশ্বকাপের ভারতীয় অঞ্চলের সম্প্রচার স্বত্ব কেনার জন্য ফিফার সঙ্গে কয়েক দফায় আলোচনা চালিয়েছিল। তবে দীর্ঘ আলোচনার পরও শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যকার সেই বাণিজ্যিক আলোচনা সফলতার মুখ দেখেনি। এ ছাড়া এশিয়ার অন্যতম প্রধান সম্প্রচার মাধ্যম ‘সনি পিকচার্স নেটওয়ার্কস ইন্ডিয়া’ (Sony Pictures Networks India)-ও এই বিশ্বকাপের স্বত্ব কেনার প্রাথমিক সম্ভাবনা ও বাণিজ্যিক দিকগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখেছিল। কিন্তু তারা শেষ পর্যন্ত ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক কোনো দরপত্র বা বিড জমা দেয়নি। ফলে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে জি নেটওয়ার্ক এই স্বত্ব লুফে নেওয়ার জন্য তাদের চূড়ান্ত প্রস্তাব পেশ করে।
নতুন এই সম্ভাব্য চুক্তি অনুযায়ী, জি নেটওয়ার্ক তাদের সদ্য বাজারে নিয়ে আসা স্পোর্টস নেটওয়ার্ক এবং নিজস্ব জনপ্রিয় ডিজিটাল ও ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ‘জি-ফাইভ’ (Zee-5)-এর মাধ্যমে বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো সরাসরি সম্প্রচার করবে। ভারতীয় উপমহাদেশের বৈচিত্র্যময় দর্শকদের কথা মাথায় রেখে প্রতিষ্ঠানটি কেবল ইংরেজি বা হিন্দি ভাষার মধ্যেই এই সম্প্রচার সীমাবদ্ধ রাখছে না। দর্শকদের জন্য একাধিক আঞ্চলিক ভাষায় খেলা দেখার বিশেষ পরিকল্পনাও গ্রহণ করেছে জি নেটওয়ার্ক। বিভিন্ন সূত্রের দাবি অনুযায়ী, জি নেটওয়ার্ক ইতোমধ্যেই তাদের এই বহুভাষিক ও বহুমাত্রিক সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আলাদা এবং বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন টিম বা দল গঠন করার কাজ শুরু করে দিয়েছে। ভারতের মুম্বাইয়ের লোয়ার পারেলে অবস্থিত তাদের নিজস্ব স্টুডিও থেকে এই বিশাল সম্প্রচার কার্যক্রমের কারিগরি ও সম্পাদকীয় প্রস্তুতিও জোরকদমে শুরু হয়ে গেছে।
ক্রীড়া সম্প্রচারে জি-এর প্রত্যাবর্তন ও বিশ্বকাপের রূপরেখা
এই ফুটবল বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব পাওয়ার বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সম্প্রচার বাজারে জি নেটওয়ার্কের একটি বিশাল ও শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন হিসেবে বিবেচনা করছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি ‘ইউনাইট৮ স্পোর্টস’ (Unite8 Sports) ব্র্যান্ডের অধীনে নতুন চারটি স্পোর্টস চ্যানেল বা ক্রীড়াভিত্তিক চ্যানেল চালুর ঘোষণা দিয়েছে। এই নতুন চ্যানেলগুলোর মধ্যে রয়েছে হিন্দি ভাষায় সম্প্রচারের জন্য ‘ইউনাইট৮ স্পোর্টস-১’ ও ‘ইউনাইট৮ স্পোর্টস-১ এইচডি’ এবং ইংরেজি ভাষায় খেলা দেখানোর জন্য ‘ইউনাইট৮ স্পোর্টস-২’ ও ‘ইউনাইট৮ স্পোর্টস-২ এইচডি’। এই নতুন চ্যানেলগুলোর মাধ্যমেই ফুটবল বিশ্বকাপের সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের মূল তথ্যাদি:
-
আয়োজক দেশসমূহ: উত্তর আমেরিকার তিনটি দেশ অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর যৌথ ও সমন্বিত আয়োজনে ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
-
টুর্নামেন্ট শুরুর তারিখ: আন্তর্জাতিক সূচি অনুযায়ী, আগামী ১১ জুন থেকে এই বিশ্বযজ্ঞের আনুষ্ঠানিক পর্দা উঠবে।
-
দলের সংখ্যা ও ম্যাচ: ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটিই হতে যাচ্ছে প্রথম ৪৮টি দেশের অংশগ্রহণে আয়োজিত সর্ববৃহৎ টুর্নামেন্ট। দল সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে পুরো টুর্নামেন্টে সর্বমোট ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে এবং ভারতীয় অঞ্চলের দর্শকেরা এর সবগুলো ম্যাচই সরাসরি উপভোগ করতে পারবেন।
সময় অঞ্চল ও ফিফার চাহিদামূল্য হ্রাসের বাস্তবতা
বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্বের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে ফিফাকে কিছু বাস্তব ও ভৌগোলিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হয়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, ভারতীয় বাজারের জন্য ফিফা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তাদের পূর্বনির্ধারিত চাহিদামূল্য বা বেস প্রাইস বেশ খানিকটা কমিয়েছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল ভারতীয় উপমহাদেশে টেলিভিশন ও ডিজিটাল মাধ্যমের দর্শকসংখ্যা হ্রাস পাওয়ার একটি বড় ধরণের আশঙ্কা।
যেহেতু এই বিশ্বকাপটি উত্তর আমেরিকার টাইম জোন বা সময় অঞ্চলে অনুষ্ঠিত হবে, তাই মেক্সিকো, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে যখন খেলা হবে, তখন ভারতীয় উপমহাদেশে থাকবে গভীর রাত কিংবা ভোরবেলা। এই প্রতিকূল সময়ের কারণে অনেক সাধারণ দর্শকের পক্ষেই সবগুলো ম্যাচ সরাসরি দেখা সম্ভব নাও হতে পারে। ফলে দর্শকসংখ্যা আশানুরূপ না হলে স্পনসরশিপ ও বিজ্ঞাপন থেকে রেভিনিউ বা আয় কমে যাওয়ার একটি বড় সংশয় ও ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। এই অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও বিজ্ঞাপন খাতের সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করেই ফিফা শেষ পর্যন্ত তাদের মূল্য কমিয়ে জি নেটওয়ার্কের সঙ্গে চুক্তিটি চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।



