মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা এবং ইরান-ইসরাইল সংঘাতের প্রভাবে উত্তাল হয়ে উঠেছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী। এই যুদ্ধসংকুল পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে বাংলাদেশি পতাকাবাহী চারটি বাণিজ্যিক জাহাজ বর্তমানে চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) একটি জাহাজ ইরানের ড্রোন হামলা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পাওয়ার পর বাংলাদেশি জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ড্রোন হামলা ও ‘বাংলার জয়যাত্রা’র বর্তমান অবস্থা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে অবস্থানকালে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’ এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়। প্রত্যক্ষদর্শী নাবিকদের তথ্যমতে, জাহাজটির মাত্র ১০০ গজ দূরে একটি ইরানি ড্রোন বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দ এবং আলোর ঝলকানিতে জাহাজে থাকা ৩১ জন নাবিকের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
জাহাজে থাকা নাবিক আতিকুল হক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানান, মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল ড্রোনটি তাদের জাহাজকেই লক্ষ্যবস্তু করেছে। ভাগ্যক্রমে জাহাজ ও নাবিকরা অক্ষত থাকলেও পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় ওই বন্দরে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করা হয়। বর্তমানে জাহাজটি পণ্য খালাস শেষ করলেও নিরাপত্তার খাতিরে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করার অনুমতি পাচ্ছে না।
ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশি জাহাজগুলোর তালিকা
নিচে হরমুজ প্রণালী ও আরব সাগরের কাছাকাছি অবস্থানে থাকা বাংলাদেশি জাহাজগুলোর বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হলো:
| জাহাজের নাম | মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান | বর্তমান অবস্থান/গন্তব্য | বর্তমান অবস্থা ও নির্দেশনা |
| এমভি বাংলার জয়যাত্রা | বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন | জেবেল আলী বন্দর, ইউএই | হরমুজ প্রণালীতে আটকা পড়া, যাত্রা স্থগিত। |
| কেএসআরএম-১ (নাম পরিবর্তিত) | কেএসআরএম গ্রুপ | ওমান (সালালা বন্দর) | গতি কমানো ও সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশ। |
| কেএসআরএম-২ (নাম পরিবর্তিত) | কেএসআরএম গ্রুপ | কুয়েতগামী | গভীর সমুদ্রে নিরাপদ অবস্থানে থাকার নির্দেশ। |
| মেঘনা গ্রুপের জাহাজ | মেঘনা গ্রুপ (এমজিআই) | আরব সাগর | শারজা যাত্রা স্থগিত, সমুদ্রে নোঙর করা। |
বেসরকারি খাতের জাহাজগুলোর নিরাপত্তা সতর্কতা
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জাহাজের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের তিনটি জাহাজও বর্তমানে সতর্কতামূলক অবস্থানে রয়েছে। কেএসআরএম গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক মেহেরুল করিম জানিয়েছেন, তাদের দুটি জাহাজের একটি ওমান ও অন্যটি কুয়েত যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাহাজ দুটির গতি কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং সেগুলোকে সরাসরি যুদ্ধের এলাকায় প্রবেশ না করে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হয়েছে।
অন্যদিকে, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান মার্কেন্টাইল শিপিং লাইনসের একটি জাহাজ জ্বালানি সংগ্রহের জন্য শারজার খোর ফাক্কান বন্দরে যাওয়ার কথা থাকলেও ঝুঁকি এড়াতে এর যাত্রা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। জাহাজটি বর্তমানে নিরাপদ জলসীমায় অবস্থানের চেষ্টা করছে।
আঞ্চলিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের খনিজ তেল পরিবহনের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই অঞ্চলে ড্রোন হামলা ও সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈশ্বিক শিপিং সেক্টরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশি জাহাজগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জীবন বিমা ও নিরাপত্তা প্রিমিয়াম বৃদ্ধি। বিএসসি এবং সংশ্লিষ্ট শিপিং লাইনগুলো নিয়মিতভাবে নাবিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এবং আন্তর্জাতিক মেরিটাইম সংস্থার গাইডলাইন অনুসরণ করছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে নাবিকদের পরিবারের মধ্যেও উদ্বেগ উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে যাতে কোনো প্রাণহানি ছাড়াই জাহাজগুলো নিরাপদ জলসীমায় ফিরে আসতে পারে। বিশেষ করে জেবেল আলী বন্দরে আটকা পড়া ‘বাংলার জয়যাত্রা’র ৩১ জন নাবিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার।



