মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের রেশ এবার আছড়ে পড়ল ভারত মহাসাগরের নীল জলরাশিতে। বুধবার (৪ মার্চ) শ্রীলঙ্কা উপকূলের অদূরে ইরানের একটি শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিধ্বংসী হামলায় অন্তত ৮০ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ পেন্টাগনে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এই হামলার দায় স্বীকার করে জানিয়েছেন, ভারত মহাসাগরে ইরানের সামরিক উপস্থিতি খর্ব করতেই এই আক্রমণ চালানো হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের নৌ-নিরাপত্তা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে।
হামলার প্রেক্ষাপট ও মার্কিন অবস্থান
পেন্টাগনের ব্রিফিংয়ে পিট হেগসেথ স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর পক্ষ থেকে ইরানের ওপর চলমান সামরিক তৎপরতা কেবল একটি সূচনামাত্র। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সামনে আরও বড় ধরনের হামলা আসছে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানি আকাশসীমার ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। শ্রীলঙ্কা উপকূলে ইরানি যুদ্ধজাহাজ ‘আইরিস ডেনা’ (IRIS Dena)-র ওপর আক্রমণ মূলত ইরানের বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন ও নৌ-কৌশলকে পঙ্গু করে দেওয়ার একটি অংশ।
উদ্ধার অভিযান ও হতাহতের পরিসংখ্যান
শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী জানিয়েছে, ইরানি জাহাজটি থেকে বিপদসংকেত পাওয়ার পরপরই তারা দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করে। প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, জাহাজটিতে মোট ১৮০ জন আরোহী ছিলেন। শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীর মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা এখন পর্যন্ত ৩২ জনকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন। অন্যদিকে, দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলকে নিশ্চিত করেছেন যে, অন্তত ৮০ জন আরোহীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বাকিদের উদ্ধারে এখনও তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
ইরানি যুদ্ধজাহাজে হামলার সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্র
| বিষয় | বিবরণ ও পরিসংখ্যান |
| আক্রান্ত জাহাজের নাম | আইরিস ডেনা (IRIS Dena) |
| হামলার স্থান | শ্রীলঙ্কা উপকূল, ভারত মহাসাগর |
| আক্রমণকারী পক্ষ | মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী |
| জাহাজে মোট আরোহী | ১৮০ জন (নথি অনুযায়ী) |
| নিহত নিশ্চিত | ৮০ জন |
| উদ্ধারকৃত জীবিত | ৩২ জন |
| নিখোঁজ সদস্য | ৬৮ জন |
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ওপর প্রভাব
শ্রীলঙ্কার মতো একটি নিরপেক্ষ দেশের জলসীমার কাছাকাছি এই ধরনের শক্তিশালী সামরিক হামলা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভারত মহাসাগরে ইরানের এই যুদ্ধজাহাজটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌ-টহল বা মহড়া শেষে ফিরছিল। মার্কিন সাবমেরিন থেকে টর্পেডো নিক্ষেপ করে জাহাজটি ডুবিয়ে দেওয়ার ফলে এই অঞ্চলে নৌ-বাণিজ্যের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। এই হামলার ফলে ইরানও লোহিত সাগর বা পারস্য উপসাগরে মার্কিন বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর পাল্টা আঘাত হানতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ শঙ্কা ও সামরিক কৌশল
মার্কিন প্রশাসনের বর্তমান সুর অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। পেন্টাগনের বক্তব্যে এটি পরিষ্কার যে, তারা ইরানকে কেবল তার ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে নয়, বরং আন্তর্জাতিক জলসীমাতেও কোণঠাসা করতে চায়। ‘আইরিস ডেনা’ ডুবে যাওয়ার এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক নৌ-আইন এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে এই ক্ষয়ক্ষতির বিপরীতে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া আসে, তার ওপর নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ। বিশেষ করে ভারত মহাসাগরে ভারত ও চীনের মতো দেশগুলোর অবস্থান এই সংকটে কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।



