খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও সামুদ্রিক বাণিজ্যে। ইরান ও মার্কিন জোটের পাল্টাপাল্টি হুমকির মুখে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি এখন কার্যত একটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এর ফলে তেলবাহী ট্যাঙ্কারের ভাড়া ও যুদ্ধঝুঁকি বীমার প্রিমিয়াম নজিরবিহীনভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির নতুন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও ট্রানশিপমেন্ট কেন্দ্র হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) বর্তমানে বহুমুখী লজিস্টিক চাপের মুখে রয়েছে।
শিপিং বাজারের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বিশাল আকারের ক্রুড অয়েল ট্যাঙ্কারগুলোর (VLCC) চার্টার ভাড়া কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক ট্যাঙ্কার ভাড়ার সূচক ‘ওয়ার্ল্ডস্কেল’-এ দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়াসহ বিভিন্ন গন্তব্যে তেল পরিবহনের খরচ এখন সাধারণ সময়ের তুলনায় কয়েকশ পয়েন্ট ওপরে অবস্থান করছে।
রয়টার্স এবং বিভিন্ন সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণ সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তত ১৫০টিরও বেশি তেল ও এলএনজি ট্যাঙ্কার বর্তমানে হরমুজ প্রণালীর প্রবেশপথে আটকা পড়ে আছে। নিরাপত্তার অভাবে অনেক জাহাজ গভীর সমুদ্রে নোঙর করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের নিরবচ্ছিন্ন চেইন বা সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
| বিষয়ের বিবরণ | বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রভাব |
| বীমা প্রিমিয়াম | প্রিমিয়ামের হার প্রায় ৫০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। |
| জাহাজের জট | হরমুজ প্রণালীর আশপাশে প্রায় ১৫০+ ট্যাঙ্কার অপেক্ষমাণ। |
| পরিবহন ভাড়া (VLCC) | ওয়ার্ল্ডস্কেল সূচকে ভাড়া কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। |
| বিকল্প রুট | হাবশান-ফুজাইরাহ পাইপলাইনের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। |
| বাণিজ্যিক প্রভাব | তেলের পাশাপাশি অ্যালুমিনিয়াম ও সার রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে। |
উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে লন্ডনভিত্তিক বীমা বাজারে। বীমা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘মার্শ’-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগে যেখানে ১০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি জাহাজের প্রতি ভ্রমণে বীমা খরচ ছিল ২.৫ লাখ ডলার, বর্তমান ঝুঁকিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩.৭৫ লাখ ডলারে। অনেক বীমাদাতা প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য নতুন কভার প্রদান স্থগিত করেছে অথবা আকাশচুম্বী অতিরিক্ত প্রিমিয়াম দাবি করছে। এই বর্ধিত খরচ শেষ পর্যন্ত জ্বালানি তেলের খুচরা দাম ও সাধারণ পণ্যের মূল্যের ওপর গিয়ে পড়ছে।
ইউএই ওপেকের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদক হওয়ায় তাদের অর্থনীতি এই প্রণালীর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তবে হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়লে আবুধাবি তাদের ‘হাবশান-ফুজাইরাহ’ পাইপলাইন ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে, যার মাধ্যমে প্রতিদিন ১.৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল সরাসরি ফুজাইরাহ বন্দরে পৌঁছানো সম্ভব। কিন্তু কুয়েত, ইরাক এবং কাতারের মতো দেশগুলোর জন্য এমন কোনো বিকল্প রুট না থাকায় তারা চরম সংকটে পড়েছে। এছাড়া দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দরের মতো বড় ট্রানশিপমেন্ট হাবগুলো এখন কনটেইনার জট ও বিলম্বিত জাহাজ সূচীর কারণে লজিস্টিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে।
বিশ্বের মোট সামুদ্রিক তেল পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে হয়ে থাকে। এছাড়া বৈশ্বিক অ্যালুমিনিয়াম রপ্তানির ১৫ শতাংশ এবং সারের একটি বিশাল অংশ এই পথেই পরিবাহিত হয়। এই জলপথ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে কেবল তেলের দামই বাড়বে না, বরং বিশ্বব্যাপী শিল্প উৎপাদন ব্যয় ও কৃষি উপকরণের দামও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়বে। আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সামরিক উত্তেজনা প্রশমিত না হলে নতুন করে বিশ্বব্যাপী মন্দা ও উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিতে পারে।
পরিশেষে, হরমুজ প্রণালীর এই সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি বিকল্প নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, সামরিক এই দাবানল বিশ্ব অর্থনীতিকে এক অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দিতে পারে।