খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আসন্ন দুই টেস্টের সিরিজকে সামনে রেখে বাংলাদেশ দলে এসেছে একাধিক পরিবর্তন। চোটের কারণে নিয়মিত কয়েকজন ক্রিকেটারকে না পাওয়ায় দল নির্বাচনে বেশ কিছুটা হিসাব-নিকাশ করতে হয়েছে নির্বাচকদের। একই সঙ্গে সামনে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকা ইমার্জিং দলের বিপক্ষে চার দিনের ম্যাচের সিরিজও বিবেচনায় রাখতে হয়েছে। ফলে অস্ট্রেলিয়া সফরের জন্য দল গঠনের পাশাপাশি ভবিষ্যতের টেস্ট ক্রিকেটার তৈরির পরিকল্পনাও মাথায় রেখেছেন নির্বাচকেরা।
দল ঘোষণার পর সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার জানান, চোটের ধাক্কায় দল সাজাতে তাদের বেশ বেগ পেতে হয়েছে। তবে শুধু বর্তমান পরিস্থিতি নয়, আগামী দিনের পরিকল্পনাও ছিল তাঁদের ভাবনায়। সেই কারণেই অস্ট্রেলিয়া সফরের দলে জায়গা না পাওয়া তাওহিদ হৃদয়, মাহমুদুল হাসান ও মাহিদুল ইসলামকে দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে চার দিনের ম্যাচ খেলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তন এসেছে ওপেনিংয়ে। মাহমুদুল হাসান জয়কে সরিয়ে পাঁচ বছর পর টেস্ট দলে ফিরেছেন সৌম্য সরকার। ২০২১ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সর্বশেষ টেস্ট খেলেছিলেন এই বাঁহাতি ওপেনার। এরপর দীর্ঘ সময় টেস্ট দলের বাইরে থাকলেও ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তাঁর পারফরম্যান্স ছিল নজরকাড়া।
জাতীয় ক্রিকেট লিগের সর্বশেষ আসরে সৌম্য সাত ম্যাচে ৪৫.২১ গড়ে ৬৩৩ রান করেন। আসরে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকও ছিলেন তিনি। ফলে দীর্ঘদিন পর টেস্ট দলে ফেরার পেছনে শুধু অভিজ্ঞতাই নয়, সাম্প্রতিক ফর্মও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে সম্ভাব্য দ্রুতগতির পেস আক্রমণ সামলানোর অভিজ্ঞতাও নির্বাচকদের বিবেচনায় এসেছে।
হাবিবুল বাশারের মতে, সৌম্য দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন এবং উচ্চগতির পেস বোলিংয়ের বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া সফরে যে ধরনের বোলিংয়ের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সেই বাস্তবতা বিবেচনা করেই তাঁকে দলে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচকেরা অন্য ওপেনারদের নিয়েও ভেবেছিলেন। কিন্তু এই মুহূর্তে প্রস্তুত অবস্থায় থাকা ডানহাতি ওপেনারের সংখ্যা কম থাকায় সৌম্যই শেষ পর্যন্ত অগ্রাধিকার পেয়েছেন।
অন্যদিকে মাহমুদুল হাসান জয়ের সাম্প্রতিক ফর্ম নির্বাচকদের উদ্বেগের কারণ হয়েছে। ওপেনিংয়ে তাঁর সর্বশেষ ছয় ইনিংসের চারটিতেই তিনি এক অঙ্কের রানে আউট হয়েছেন। ওই সময়ে তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে মাত্র একটি অর্ধশতক। নির্বাচকদের দৃষ্টিতে, অস্ট্রেলিয়ার মতো কঠিন কন্ডিশনে তাঁকে সরাসরি খেলানোর চেয়ে কিছুটা সময় দিয়ে আত্মবিশ্বাস ও ফর্ম ফিরিয়ে আনার সুযোগ দেওয়াই ভালো হবে। অস্ট্রেলিয়া সফরে একাদশে তাঁর খেলার সুযোগও সীমিত হতে পারে—এই বিষয়টিও দল নির্বাচনের সময় বিবেচনায় এসেছে।
মাঝের সারির ব্যাটিংয়েও এসেছে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। গত মাসে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টে অভিষেক হয়েছিল তাওহিদ হৃদয়ের। তবে অভিষেক ম্যাচটি তাঁর জন্য সুখকর হয়নি। বাংলাদেশ ইনিংস ব্যবধানে ম্যাচটি হারে, আর হৃদয় দুই ইনিংসে করেন যথাক্রমে ২ ও ৯ রান। সেই ম্যাচের পরই অস্ট্রেলিয়া সফরের দলে তাঁর জায়গা হয়নি।
তবে হৃদয়কে ভবিষ্যতের টেস্ট পরিকল্পনা থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। বরং তাঁকে আরও প্রস্তুত করে তুলতেই দক্ষিণ আফ্রিকা ইমার্জিং দলের বিপক্ষে চার দিনের ম্যাচে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মেহেদী হাসান মিরাজ দলে ফিরে আসায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হৃদয়ের একাদশে জায়গা পাওয়ার সম্ভাবনা কম ছিল। তাই প্রতিযোগিতামূলক চার দিনের ক্রিকেটে তাঁকে আরও অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ করে দেওয়াকেই বেশি কার্যকর মনে করেছেন নির্বাচকেরা।
একই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মাহিদুল ইসলামও দক্ষিণ আফ্রিকায় যাচ্ছেন। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট দলে থাকলেও একাদশে খেলার সুযোগ পাননি এই উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান। অস্ট্রেলিয়া সফরের দলে জায়গা না পেলেও ‘এ’ দলের হয়ে চার দিনের ম্যাচ খেলে নিজেকে প্রস্তুত করার সুযোগ পাচ্ছেন তিনি।
অস্ট্রেলিয়া সফরে উইকেটের পেছনে দায়িত্ব পালন করবেন জাকের আলী। গত বছরের জুনে সর্বশেষ টেস্ট খেলা এই উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যানও দীর্ঘ বিরতির পর দলে ফিরেছেন। তাঁর ক্ষেত্রে নির্বাচকদের মূল্যায়নে এসেছে ফর্ম ও মানসিক প্রস্তুতির বিষয়টি। জাতীয় দলের বাইরে থাকার সময় তিনি হাই পারফরম্যান্স কর্মসূচির ম্যাচগুলোতে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। সেখানে ভালো পারফরম্যান্সের পরই আবার টেস্ট দলে ফিরেছেন বলে মনে করেন প্রধান নির্বাচক।
বাংলাদেশের জন্য অস্ট্রেলিয়া সফর বরাবরই কঠিন চ্যালেঞ্জের। সেখানে গতি, বাউন্স এবং প্রতিকূল কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া ব্যাটসম্যানদের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। সেই বাস্তবতায় সৌম্যের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর পাশাপাশি তরুণদের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির পথও খোলা রাখছেন নির্বাচকেরা। ফলে এবারের দল নির্বাচনকে শুধু একটি সিরিজের জন্য তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং অভিজ্ঞতা, সাম্প্রতিক ফর্ম এবং ভবিষ্যতের টেস্ট পরিকল্পনার সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সূচি অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্ট খেলবে বাংলাদেশ। সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট শুরু হবে ২২ আগস্ট ম্যাকাইতে। একই সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকা ইমার্জিং দলের বিপক্ষে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের প্রথম চার দিনের ম্যাচ শুরু হবে ১৬ আগস্ট। দ্বিতীয় ম্যাচটি মাঠে গড়াবে ২৩ আগস্ট। ফলে দুই সিরিজকে সামনে রেখে বাংলাদেশ ক্রিকেটের নির্বাচনী পরিকল্পনায় একদিকে যেমন অস্ট্রেলিয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে তেমনি ভবিষ্যতের টেস্ট ক্রিকেটারদের প্রস্তুত করার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পেয়েছে।