খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
ফরিদপুরের মধুখালীতে দাবি করা যৌতুকের টাকা না পেয়ে স্ত্রী রমা বিশ্বাসকে (২৫) গলায় নাইলনের সুতা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যার দায়ে স্বামী মনোজিত সরকারকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। দীর্ঘ সাত বছর ধরে চলা বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুরে ফরিদপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) শামীমা পারভীন চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায় ঘোষণা করেন।
আমৃত্যু কারাদণ্ডের পাশাপাশি দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বিচারক আদেশে উল্লেখ করেন, এই জরিমানার পুরো অর্থ আদায় করে ভুক্তভোগী পরিবারের হাতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও ফরিদপুরের জেলা প্রশাসককে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। রায় ঘোষণার সময় অভিযুক্ত মনোজিত সরকার আদালতে অনুপস্থিত থাকায় তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। একই মামলায় অপরাধে সম্পৃক্ততা প্রমাণিত না হওয়ায় মনোজিতের ছয় স্বজন—বিপুল সরকার, সরজিৎ সরকার, লিটন সরকার, বিপ্লব সরকার, সবুজ সরকার ও দীপালী সরকারকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন আদালত।
মামলার নথি ও এজাহারের বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৫ সালের শুরুতে মধুখালী উপজেলার জারজননগর গ্রামের রঞ্জন বিশ্বাসের মেয়ে রমা বিশ্বাসের সঙ্গে একই উপজেলার কলাইকান্দা গ্রামের চিত্ররঞ্জন সরকারের ছেলে মনোজিত সরকারের বিয়ে হয়। তাদের দম্পত্য জীবনে একটি কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। বিয়ের সময় মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে যৌতুক হিসেবে চার লাখ টাকা নগদ, সাড়ে তিন ভরি সোনা এবং প্রায় ৫০ হাজার টাকা মূল্যের আসবাবপত্র দেয় কনের পরিবার।
তবে এতেও মনোজিতের লোভ কমেনি। বিয়ের পর থেকেই অতিরিক্ত টাকার দাবিতে রমার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো। মেয়ের সংসার বাঁচাতে ও নির্যাতন বন্ধের আশায় রমার পরিবার কয়েক দফায় আরও এক লাখ টাকা দেয়। তা সত্ত্বেও ২০১৮ সালের ৫ এপ্রিল মনোজিত আবারও এক লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন। এই দাবি পূরণ করতে না পারায় ওই বছরের ২০ এপ্রিল বিকেলে স্ত্রী রমা বিশ্বাসকে গলায় নাইলনের সুতা পেঁচিয়ে নির্মমভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন তিনি।
হত্যাকাণ্ডের পর অপরাধ ধামাচাপা দিতে কৌশলের আশ্রয় নেন মনোজিত। তিনি মধুখালী থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেন এবং রমার বাবার বাড়ীতে খবর পাঠান যে, পেটের তীব্র ব্যথা সহ্য করতে না পেরে রমা গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে চিকিৎসকের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে এটি কোনো আত্মহত্যা ছিল না, বরং রমাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে।
ময়নাতদন্তের সত্যতা প্রকাশের পর ২০১৮ সালের ১০ মে রমার বাবা রঞ্জন বিশ্বাস বাদী হয়ে মনোজিত সরকারসহ তার পরিবারের সাতজনের বিরুদ্ধে মধুখালী থানায় যৌতুকের দাবিতে হত্যা ও নির্যাতনের মামলা দায়ের করেন। মামলা তদন্ত শেষে মধুখালী থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) মাহাবুল করিম ২০১৮ সালের ২৪ অক্টোবর সাত আসামির বিরুদ্ধেই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
আদালতের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট গোলাম রব্বানী ভূঁইয়া জানান, যৌতুক আমাদের সমাজের জন্য একটি ভয়াবহ ব্যাধি ও অভিশাপ। এই রায়ের মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা গেল যে, যৌতুকের জন্য নির্যাতন কিংবা হত্যা করে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই; অপরাধীকে আইনের আওতায় আসতেই হবে।