শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলায় চলতি বোরো মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলন হলেও কৃষকদের চোখেমুখে এখন দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। মাঠজুড়ে সোনালি ধানের সমারোহ থাকলেও শ্রমিকের উচ্চ মজুরি এবং ধানের নিম্নমুখী বাজারদরের কারণে প্রান্তিক চাষিরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। একদিকে প্রকৃতির অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে উৎপাদন খরচের চেয়ে বিক্রয়মূল্য কম হওয়ায় ধান চাষ এখন লোকসানি পেশায় পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
প্রতিকূল আবহাওয়া ও শ্রমিক সংকট
বর্তমানে ঝিনাইগাতীর কালিনগড় ও মাঝলিকান্দসহ বিভিন্ন গ্রামে পুরোদমে ধান কাটা শুরু হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অনিয়মিত ঝড় ও বৃষ্টির কারণে নিচু জমির ধান তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। জলাবদ্ধ জমিতে ধান কাটা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হওয়ায় কৃষকদের অতিরিক্ত মজুরি দিয়ে শ্রমিক নিয়োগ করতে হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় শ্রমিকের সংখ্যা কম হওয়ায় মজুরি প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা সাধারণ সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
বাজারমূল্য ও উৎপাদন ব্যয়ের ব্যবধান
কৃষকদের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ ধান ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকার মধ্যে কেনাবেচা হচ্ছে। অথচ একজন শ্রমিকের একদিনের মজুরি মেটাতেই ১ হাজার টাকার বেশি প্রয়োজন। অর্থাৎ, এক মণ ধান বিক্রি করেও একজন শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। হালচাষ, উন্নত মানের বীজ, সেচ, সার এবং কীটনাশকের মূল্য কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় ধানের উৎপাদন খরচও অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে অনেক কৃষক ঋণের বোঝা এবং দোকানের বকেয়া পরিশোধ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যান ও নির্দেশনা
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা এবং বর্তমান বাজারদরের একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | বিবরণ/তথ্য |
| চাষকৃত মোট জমির পরিমাণ | ১৪ হাজার ৬০০ হেক্টর |
| ধানের জাত | উচ্চ ফলনশীল ও স্থানীয় জাত |
| বর্তমান বাজারমূল্য (প্রতি মণ) | ৭৫০ – ৯০০ টাকা |
| সরকারি নির্ধারিত মূল্য (প্রতি মণ) | ১ হাজার ৪৪০ টাকা |
| একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি | ১,০০০ – ১,১০০ টাকা |
| ধান কাটার উপযুক্ত সময় | ৮০ শতাংশ পেকে গেলে |
সরকারি ধান সংগ্রহের প্রত্যাশা
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ফরহাদ হোসেন জানান যে, ইতোমধ্যে ধান কাটা শুরু হয়েছে এবং আগামী সপ্তাহ নাগাদ তা পূর্ণ গতি লাভ করবে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার পূর্বাভাস থাকায় তিনি কৃষকদের ৮০ শতাংশ ধান পেকে গেলেই তা দ্রুত ঘরে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন। সরকার এ বছর প্রতি মণ ধানের ক্রয়মূল্য ১ হাজার ৪৪০ টাকা নির্ধারণ করেছে। তবে স্থানীয় কৃষকদের দাবি, সরকারি পর্যায়ে ধান ক্রয় প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করা না হলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ কৃষকেরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। যদি সরকার দ্রুত বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা না নেয়, তবে ভবিষ্যতে কৃষকেরা ধান আবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।



