খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক এবং প্রতিবেশী সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেছেন বিএনপির সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) সিরাজ। সোমবার (২২ জুন) অনুষ্ঠিত ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট আলোচনার দ্বাদশ দিনে অংশ নিয়ে তিনি দুই দেশের ভূরাজনৈতিক ও পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর বিশদ আলোকপাত করেন। তিনি মন্তব্য করেন যে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিচ্ছেদ বা ডিভোর্স ঘটা সম্ভব হলেও প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারত ও বাংলাদেশের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বিচ্ছেদ হওয়া সম্ভব নয়।
সংসদ সদস্য জিএম সিরাজ তাঁর বক্তব্যে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতার বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ক্ষণস্থায়ী হতে পারে এবং তাদের মধ্যে আইনি প্রক্রিয়ায় বিচ্ছেদ ঘটাও অসম্ভব কিছু নয়। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার ভৌগোলিক ও প্রতিবেশী সম্পর্কের কোনো ধরনের বিচ্ছেদ হতে পারে না। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, প্রতিবেশীকে কখনই অস্বীকার করা বাস্তবসম্মত বা সম্ভব নয়। এই চিরন্তন সত্যটি ভারত বা বাংলাদেশ—কোনো দেশের পক্ষেই অমান্য করা সম্ভব নয়।
তিনি দুই দেশের এই সম্পর্ক নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে নিজের অভিমত ব্যক্ত করার জন্য সংসদের নিকট অতিরিক্ত সময় চেয়ে নেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক এবং রাজনৈতিক পক্ষ চায় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ এবং সম্মানজনক সম্পর্ক বজায় থাকুক। দুই দেশের এই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক যেন কোনোভাবেই ক্ষণস্থায়ী বা সাময়িক সংকটে পর্যবসিত না হয়, সে বিষয়ে তিনি তাঁর দৃঢ় বিশ্বাসের কথা ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর সাম্প্রতিক কার্যকাল ও বক্তব্য প্রসঙ্গেও সংসদে কথা বলেন বিএনপির এই সংসদ সদস্য। তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশে দায়িত্ব গ্রহণের পর ভারতের নতুন হাইকমিশনার দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক সম্পর্ককে অত্যন্ত কাব্যিক ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী তাঁর বক্তব্যে বলেছিলেন যে, ভারত ও বাংলাদেশ মূলত একই আকাশ এবং একই বাতাসের নিচে অবস্থান করছে, যার ফলে দুই দেশের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব বজায় রাখা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
তবে ভারতের নতুন হাইকমিশনারের এই ইতিবাচক ও কাব্যিক বক্তব্যের পর বাংলাদেশের জনসাধারণের ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়ার চিত্রটিও তিনি তুলে ধরেন। জিএম সিরাজ জানান, এই বক্তব্যের পর বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় তীব্র বিতর্কের ঝড় উঠতে দেখা গেছে। সেখানে ব্যাপকভাবে ভারতবিরোধী বিভিন্ন ধরনের আলোচনা ও সমালোচনা দৃশ্যমান হয়েছে। এই ধরনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া কেন তৈরি হলো, সেই মূল কারণটি খুঁজে বের করা এবং তা খতিয়ে দেখা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিদ্যমান সংকটগুলো নিরসনে ভারতের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানান এমপি জিএম সিরাজ। বিশেষ করে ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে ‘পুশ ইন’ বা ভারতের ভাষায় ‘পুশ ব্যাক’ করার যে প্রক্রিয়া সচরাচর দেখা যায়, তা অনতিবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানান তিনি। ভারতের বর্তমান সরকারের প্রতি সবিনয় অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, এই ধরনের পুশ ইন বন্ধ করার মাধ্যমে দুই দেশের সাধারণ মানুষের হৃদয়ের সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব। ভারত ও বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও হৃদয়ের সম্পর্ক জোরদার করার মাধ্যমেই কেবল সব ধরনের বিরোধিতার অবসান ঘটানো সম্ভব, যাতে দুই দেশই শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করতে পারে।
একই সঙ্গে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষায় আরেকটি মারাত্মক ব্যাধি হিসেবে মাদক চোরাচালানের বিষয়টি তিনি উত্থাপন করেন। তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন যে, সীমান্ত দিয়ে আসা সর্বগ্রাসী মাদক বর্তমানে বাংলাদেশের যুব সমাজ, ছাত্র সমাজসহ দেশের সমস্ত শ্রেণিপেশার মানুষকে মারাত্মকভাবে গ্রাস করছে এবং সামগ্রিক সমাজব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই সর্বগ্রাসী মাদকের বিস্তার রোধেও সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় ভারতকে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।