খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরের (এজেকে) রাওয়ালকোটে পুলিশ ও সদ্য নিষিদ্ধ ঘোষিত যৌথ আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির (জেএএসি) সমর্থকদের মধ্যে এক ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। রোববার সংঘটিত এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ফলে অন্তত সাতজন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। সোমবার স্থানীয় সরকারি এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বরাতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এই তথ্য প্রকাশ করে। কয়েকদিন ধরে চলা এই সহিংস আন্দোলনের ফলে সমগ্র আজাদ কাশ্মীর অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তপ্ত ও থমথমে রূপ ধারণ করেছে।
আজাদ কাশ্মীরের (এজেকে) পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) লিয়াকত আলী মালিক এই সংঘর্ষের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেছেন। তিনি জানান, রোববার বিক্ষোভকারীদের সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দফায় দফায় চলা সংঘর্ষে অন্তত ২৩ জন পুলিশ সদস্য মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং সহিংসতা প্রতিরোধে রোববার গভীর রাতে পুলিশ বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। এই নৈশকালীন অভিযানকালে ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে অন্তত ৩০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র মতে, আজাদ কাশ্মীরের রাওয়ালকোটে গত কয়েকদিন ধরেই এই সহিংস বিক্ষোভ ও সংঘাত চলছে। এর আগে গত শনিবার বিক্ষোভকারীদের সাথে সংঘর্ষের সময় কর্তব্যরত অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্তত চারজন সদস্য নিহত হয়েছিলেন। শনিবারের সেই ঘটনার পর থেকে পুরো এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হলেও রোববার পুনরায় নতুন করে এই ব্যাপক সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে।
স্থানীয় সূত্র এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই চলমান সহিংসতার পেছনে একটি নির্দিষ্ট পূর্ববর্তী ঘটনা রয়েছে। গত শুক্রবার রাতে ওই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের এক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। সেই সংঘর্ষের সময় স্থানীয় একজন ব্যবসায়ী গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন বলে অভিযোগ ওঠে। ওই ব্যবসায়ীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করেই স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও জেএএসি সমর্থকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়। এই মৃত্যুর ঘটনার প্রতিবাদে এবং বিচার দাবিতে পরবর্তীতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, যা রবিবারের এই ব্যাপক প্রাণঘাতী সংঘর্ষে রূপ নেয়।
সরকারি কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, রোববার আন্দোলন চলাকালীন উত্তেজিত বিক্ষোভকারীরা রাওয়ালকোটের কম্বাইন্ড মিলিটারি হাসপাতাল (সিএমএইচ) প্রাঙ্গণে হামলা চালিয়েছিল। এই হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে জানা যায়, রাওয়ালকোটের প্রধান সড়কে অবস্থান নেওয়া বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিতে পুলিশ অগ্রসর হলে উত্তেজিত জনতা তাদের মুখোমুখি হয় এবং বাধা প্রদান করে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে। একই সাথে তারা বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার উদ্দেশ্যে টিয়ার গ্যাস বা কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। পুলিশের এই অ্যাকশনের জবাবে বিক্ষোভকারীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে উপর্যুপরি পাথর নিক্ষেপ করতে থাকে। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি অনুযায়ী, এই নির্দিষ্ট ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় নতুন করে কেউ আহত হননি।
পাকিস্তানের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘দ্য ডন’-এর প্রতিবেদন অনুসারে, রাওয়ালকোট ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের প্রকৃত পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, সরকারিভাবে সাতজন বেসামরিক ব্যক্তির মৃত্যুর কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।
সহিংসতা ও নতুন কোনো গুজব ছড়ানো রোধ করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুরো আজাদ কাশ্মীর অঞ্চলে মোবাইল ডেটা বা ইন্টারনেট সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে সমগ্র অঞ্চল থেকে তথ্যপ্রবাহ অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়েছে, যার ফলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের সঠিক পরিসংখ্যান তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন রাখা হয়েছে।