খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলায় দোকানঘর নির্মাণকে কেন্দ্র করে এক তরুণকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। নিহত তরুণ বাবু রাঢ়ী (২৫) নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। জমি সংক্রান্ত সামান্য বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। আজ বুধবার ভোরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। মর্মান্তিক এই ঘটনার পর মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের সাদেকপুর গ্রামসহ পুরো এলাকায় গভীর শোক ও তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে।
নিহত বাবু রাঢ়ীর পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে জানা গেছে, পশ্চিম সাদেকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে নিজেদের জমিতে একটি দোকানঘর নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন বাবু। কিন্তু এই দোকান নির্মাণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় একটি পক্ষের সাথে তাঁর দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এর আগেও প্রায় এক মাস আগে এই একই কারণে বাবুকে মারধর করা হয়েছিল বলে তাঁর পরিবার দাবি করেছে।
গতকাল মঙ্গলবার রাত আটটার দিকে এই পুরনো বিরোধের জেরে আবারো বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের অভিযোগ, কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে স্থানীয় বাসিন্দা বজলু বয়াতী, জাহাঙ্গীর মাল, শহীদ পোদ্দার ও নয়ন পোদ্দারসহ ৮ থেকে ৯ জনের একটি দল দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে বাবুর ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা বাবুকে বেধড়ক পিটিয়ে মাথা ফাটিয়ে দেয় এবং হাত-পা ভেঙে গুরুতর জখম করে।
মারধরের পর বাবু অচেতন হয়ে মাটিতে পড়ে থাকলে হামলাকারীরা চলে যায়। প্রতিবেশী এক নারীর মাধ্যমে খবর পেয়ে বাবুর বাবা দুলাল রাঢ়ী ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং ছেলেকে উদ্ধার করেন। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় বাবুকে দ্রুত মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় কর্তব্যরত চিকিৎসক রাত ১০টার দিকে তাঁকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন।
সেখানেও বাবুর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকলে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাত ১২টার দিকে চিকিৎসকরা তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন। স্বজনরা জানান, অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছানোর পর ভোর চারটার দিকে কোনো চিকিৎসা শুরু করার আগেই কর্তব্যরত চিকিৎসক বাবুকে মৃত ঘোষণা করেন।
সন্তানকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ বাবা দুলাল রাঢ়ী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার ছেলেকে ৮-৯ জন মিলে নির্মমভাবে পিটিয়েছে। মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে, হাত-পা ভেঙে দিয়েছে। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সে ছিল দ্বিতীয়। এইচএসসি পাস করে সে পরিবারটিকে টেনে তোলার চেষ্টা করছিল।” বাবুর চাচা খোরশেদ রাঢ়ী একে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে দ্রুত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় তাদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে নিহত বাবু রাঢ়ীর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা সভাপতি নীরব ব্যাপারী জানান, বাবু তাঁদের সংগঠনের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। তবে সংগঠনের ভেতরের কিছু অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে তাঁকে কোনো সুনির্দিষ্ট পদ দেওয়া সম্ভব হয়নি। পুলিশের তদন্তে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে এই ঘটনার পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই বলে দাবি করেছেন মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি গিয়াস উদ্দিন দীপেন। তিনি বলেন, আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি, সম্পূর্ণ পারিবারিক বা স্থানীয় জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটেছে। এর সাথে রাজনীতির কোনো যোগসূত্র নেই।
এলাকাবাসী জানিয়েছেন, বাবু রাঢ়ী এলাকায় শান্ত স্বভাবের ছেলে হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সামান্য দোকানঘর তৈরি করা নিয়ে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড তারা মেনে নিতে পারছেন না। মেহেন্দীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মমিন উদ্দিন জানিয়েছেন, ঘটনাটি পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছে। ঘটনার সাথে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশি অভিযান শুরু হয়েছে এবং মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।