খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
বাংলা সাহিত্য, চিন্তাচর্চা ও বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে এক অনন্য উচ্চতার নাম আহমদ ছফা। তিনি ছিলেন একজন নির্ভীক চিন্তাবিদ, প্রথাবিরোধী লেখক, তীক্ষ্ণ সমাজবিশ্লেষক এবং মুক্তবুদ্ধির এক উজ্জ্বল প্রতীক। তাঁর লেখনী যেমন প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে, তেমনি সত্যের পক্ষে আপসহীন থাকার সাহসও জুগিয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে।
আহমদ ছফা ১৯৪৩ সালের ৩০ জুন চট্টগ্রামের চান্দনাইশ উপজেলার গাছবাড়িয়া গ্রামের এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা-মায়ের দ্বিতীয় সন্তান তিনি। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। স্কুল ও কলেজের শিক্ষা শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হলেও পরবর্তীতে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
কিছুদিন সমাজবিজ্ঞান নিয়ে পদ্ধতিগত গবেষণায় যুক্ত থাকলেও তাঁর প্রকৃত আগ্রহ ছিল মৌলিক চিন্তা ও সৃজনশীল সাহিত্যচর্চায়। তাই গবেষণার আনুষ্ঠানিক পরিসর ছেড়ে তিনি আত্মনিয়োগ করেন লেখালেখি, দর্শনচর্চা এবং সমাজ-রাষ্ট্র নিয়ে গভীর বিশ্লেষণে। জীবনের বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকতা, পত্রিকা সম্পাদনা, প্রকাশনা, প্রেস ব্যবসা ও এনজিও কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও লেখালেখিই ছিল তাঁর আজীবনের প্রধান সাধনা।
ছাত্রজীবনেই তিনি ‘সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস’ রচনা করেন। তবে তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ছিল উপন্যাস ‘সূর্য তুমি সাথী’। পরবর্তীকালে প্রবন্ধ, উপন্যাস, গল্প, কবিতা, অনুবাদ, ভ্রমণকাহিনি, শিশু-কিশোর সাহিত্যসহ নানা ধারায় তিনি ত্রিশেরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’, ‘বাঙালি মুসলমানের মন’, ‘যদ্যপি আমার গুরু’, ‘অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী’, ‘পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ’, ‘ওঙ্কার’, ‘গাভী বিত্তান্ত’ এবং ‘মরণবিলাস’। এসব গ্রন্থ বাংলা সাহিত্য ও চিন্তার ভুবনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে।
তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ’ জাপানি ভাষায় এবং কবিতা ‘বস্তি উজাড়’ জার্মান ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এছাড়া *’ওঙ্কার’*সহ তাঁর একাধিক রচনা ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। ‘ওঙ্কার’ উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে।
আহমদ ছফা ছিলেন একজন দক্ষ অনুবাদকও। জার্মান কবি গ্যেটে-র বিশ্ববিখ্যাত কাব্যনাট্য ‘ফাউস্ট’-এর বাংলা অনুবাদ তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি। পাশাপাশি তিনি বেশ কিছু গানও রচনা করেছেন।
প্রতিষ্ঠান, ক্ষমতা ও প্রচলিত চিন্তার অন্ধ অনুসরণের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল সবসময়ই দৃঢ় ও আপসহীন। এ কারণে তিনি যেমন প্রশংসিত হয়েছেন, তেমনি বিতর্কেরও কেন্দ্রে ছিলেন। কিন্তু সত্য উচ্চারণে তিনি কখনো আপস করেননি। নবীন লেখক, শিল্পী ও চিন্তাশীল তরুণদের উৎসাহিত করা, তাঁদের প্রতিভা বিকাশে পাশে দাঁড়ানো এবং স্বাধীন চিন্তার পরিবেশ সৃষ্টি করাও ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
তিনি বাংলাদেশ লেখক শিবির-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হলেও পরবর্তীতে সেই সংগঠনের দেওয়া পুরস্কার গ্রহণ করেননি। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার সুযোগ করে দিতে শিল্পী এস এম সুলতান-এর উদ্যোগে ‘সুলতান পাঠশালা’ প্রতিষ্ঠায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সমাজচিন্তায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০০২ সালে (মরণোত্তর) একুশে পদক লাভ করেন।
২০০১ সালের ২৮ জুলাই ঢাকায় এই প্রজ্ঞাবান চিন্তাবিদের জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর চিন্তা, সাহসী উচ্চারণ এবং কালজয়ী সাহিত্যকর্ম আজও বাঙালির মননকে আলোড়িত করে, নতুন করে ভাবতে শেখায়।
প্রজ্ঞা, সততা ও স্বাধীন চিন্তার এই বিরল সাধক আহমদ ছফার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।