এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
পৃথিবীতে মানুষের জীবনে এমন কিছু আশীর্বাদ আছে, যার গভীরতা কোনো ভাষায় সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করা যায় না। সন্তান তেমনই এক অনন্য উপহার। সৃষ্টিকর্তা যখন একটি পরিবারকে সন্তানের আশীর্বাদে ধন্য করেন, তখন শুধু একটি নতুন প্রাণের জন্ম হয় না; জন্ম নেয় নতুন স্বপ্ন, নতুন আশা, নতুন সম্ভাবনা। একটি নিষ্পাপ মুখ, একটি নির্মল হাসি, টলমল পায়ে প্রথম হাঁটা কিংবা আধো আধো কণ্ঠে প্রথম ডাক—এসব মুহূর্ত একটি পরিবারের জীবনকে নতুন অর্থে, নতুন আলোয় ভরে তোলে।
সন্তান কেবল বাবা-মায়ের রক্তের উত্তরাধিকার নয়; সে তাঁদের বিশ্বাস, ভালোবাসা, ত্যাগ, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি বাবা-মায়ের জীবনসংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে তাঁর সন্তান। নিজেদের অনেক ইচ্ছা-অনিচ্ছা, স্বপ্ন-অভিলাষ, আরাম-আয়েশ ও ব্যক্তিগত সুখ বিসর্জন দিয়ে তাঁরা সন্তানের জন্য একটি সুন্দর আগামী নির্মাণে নিরলস পরিশ্রম করেন। তাঁদের একটাই আকাঙ্ক্ষা—সন্তান যেন কেবল সফল নয়, একজন সত্যিকারের মানুষ হয়ে ওঠে; যার চরিত্রে থাকবে সততা, বিনয়, ন্যায়বোধ, সহমর্মিতা, দায়িত্বশীলতা এবং মানবিকতার দীপ্তি।
কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সমাজের মূল্যবোধেও নীরব পরিবর্তন ঘটছে। প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের সঙ্গে মানুষের হৃদয়ের দূরত্ব বাড়িয়েছে। একসময় যে পরিবারে একসঙ্গে বসে গল্প হতো, প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ছিল শিক্ষার উৎস, পারস্পরিক সহযোগিতা ছিল পারিবারিক সংস্কৃতির অংশ—আজ সেই চিত্র ক্রমেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। আত্মকেন্দ্রিকতা, অস্থিরতা, ভোগবাদ, অহংকার এবং অসুস্থ প্রতিযোগিতা আমাদের সম্পর্কগুলোকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দিচ্ছে।
আজ আমরা অনেকেই নিজের সন্তানকে সময় দেওয়ার চেয়ে অন্যের সন্তানকে বিচার করতে বেশি আগ্রহী। কোনো শিশু বা তরুণ ভালো কিছু অর্জন করলে তাকে অভিনন্দন জানানোর পরিবর্তে আমরা অনেক সময় তার সাফল্যের পেছনে সন্দেহের গল্প খুঁজি। প্রশংসার বদলে সমালোচনা, অনুপ্রেরণার বদলে ঈর্ষা এবং শুভকামনার বদলে বিদ্বেষের চর্চা করি। আরও দুঃখের বিষয়, আমাদের এই আচরণ নীরবে আমাদের সন্তানদের মনেও প্রভাব ফেলে।
একটি শিশু কখনো কথার চেয়ে আচরণ থেকে বেশি শিক্ষা নেয়। সে দেখে, শোনে, অনুভব করে এবং ধীরে ধীরে আমাদের জীবনযাপনকেই নিজের জীবনদর্শন হিসেবে গ্রহণ করে। তাই আমরা যদি প্রতিনিয়ত অন্যের সমালোচনা করি, বিদ্বেষ পোষণ করি কিংবা মানুষের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হই, তাহলে সেই বিষবীজ একদিন আমাদের সন্তানদের মনেও অঙ্কুরিত হবে। আর যদি তারা দেখে আমরা মানুষের ভালোকে সম্মান করি, অন্যের সাফল্যে আনন্দিত হই, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই এবং বিনয়কে মর্যাদা দিই, তবে তারাও একদিন তেমন মানুষই হয়ে উঠবে।
শিশুর মন একখণ্ড উর্বর জমির মতো। সেখানে যে বীজ বপন করা হবে, ভবিষ্যতে সেই ফসলই জন্ম নেবে। তাই আমাদের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি আচরণ এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তই সন্তানের চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আমাদের পূর্বপুরুষদের দিকে তাকালে আমরা দেখি, তাঁদের অনেকের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা সীমিত ছিল; কিন্তু জীবনবোধ ছিল গভীর। তাঁদের চরিত্রে ছিল সততা, আত্মমর্যাদা, ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা, সহমর্মিতা এবং মানুষের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা। বিশেষ করে আমাদের মায়েরা—সেই সহজ-সরল আটপৌরে নারীরা—ছিলেন একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় শিক্ষালয়। তাঁরা শুধু সন্তান জন্ম দেননি; তাঁরা মানুষ গড়েছেন। তাঁদের মুখের ভাষা, আচরণের সৌন্দর্য, মমতা, ত্যাগ, ধৈর্য এবং নীরব প্রজ্ঞাই ছিল সন্তানের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ পাঠ্যপুস্তক।
আজ আমরা সন্তানদের উন্নত শিক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং নানা সুযোগ-সুবিধা দিতে ব্যস্ত। কিন্তু আমাদের নিজেদেরই একটি প্রশ্ন করা প্রয়োজন—আমরা কি তাদের হৃদয়ে মানবিকতার আলো জ্বালাতে পারছি? আমরা কি তাদের শেখাচ্ছি, মানুষের মর্যাদা তার অর্থ বা ক্ষমতায় নয়; তার চরিত্র, সততা, সহানুভূতি এবং কর্মে?
মনে রাখতে হবে, একটি সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার সন্তানদের চরিত্র দিয়ে। জ্ঞান মানুষকে দক্ষ করে, কিন্তু মূল্যবোধ তাকে মহান করে। আর সেই মূল্যবোধের প্রথম বিদ্যালয় হলো পরিবার।
তাই আজ প্রয়োজন সন্তানদের শুধু কর্মজীবনের জন্য নয়, জীবনযাপনের জন্যও প্রস্তুত করা। তাদের শেখাতে হবে সত্যবাদিতা, দায়িত্ববোধ, সহনশীলতা, ন্যায়পরায়ণতা, কৃতজ্ঞতা, সৌজন্য, পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা। কারণ সুন্দর মানুষ তৈরি হলে সুন্দর সমাজ গড়ে ওঠে; আর সুন্দর সমাজই একটি সমৃদ্ধ জাতির ভিত্তি।
আসুন, আমরা অন্যের সন্তানকে নিয়ে ব্যস্ত না হয়ে নিজের সন্তানকে নিয়ে ভাবি। আমরা তাদের কী শিখাচ্ছি, কী দেখাচ্ছি, কোন মূল্যবোধে বড় করছি—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি। কারণ আজকের শিশুরাই আগামী দিনের সমাজ, রাষ্ট্র ও মানবতার নির্মাতা।
শেষ করি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষকের কথা স্মরণ করে।
আমার আটপৌরে মা—তিনি কোনো নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ছিলেন না, কিন্তু তিনিই ছিলেন আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তিনি কোনো বই লিখে যাননি, কিন্তু তাঁর জীবনই ছিল আমার সবচেয়ে বড় পাঠ্যগ্রন্থ। তাঁর সরলতা আমাকে বিনয় শিখিয়েছে, তাঁর ত্যাগ আমাকে দায়িত্ববোধ শিখিয়েছে, তাঁর মমতা আমাকে মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। আমার বিবেক, আমার মূল্যবোধ, আমার মানবিকতার ভিত গড়ে উঠেছে তাঁর নীরব শিক্ষার ওপর। আজ আমি যা কিছু ভালো, যা কিছু সুন্দর, তার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান সেই সাধারণ অথচ অসাধারণ মায়ের।
সৃষ্টিকর্তার কাছে আমাদের আন্তরিক প্রার্থনা—
পৃথিবীর প্রতিটি সন্তান সুস্থ, নিরাপদ ও আলোকিত জীবন লাভ করুক। তারা জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সততা, মানবিকতা ও সহমর্মিতায় সমৃদ্ধ হোক। তাদের হৃদয় হোক উদার, বিবেক হোক জাগ্রত, চরিত্র হোক নির্মল। তারা যেন নিজেদের পরিবার, সমাজ, দেশ এবং সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে কাজ করতে পারে।
আমাদের পরিবার হোক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক আস্থার আশ্রয়। আমাদের সমাজ হোক সহনশীল, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক। আর আগামী প্রজন্ম হয়ে উঠুক এমন এক আলোকিত প্রজন্ম, যারা বিভেদ নয়, সম্প্রীতি; বিদ্বেষ নয়, ভালোবাসা; স্বার্থ নয়, মানবকল্যাণকে জীবনের সর্বোচ্চ আদর্শ হিসেবে ধারণ করবে।
লেখকঃ সম্পাদক ও প্রকাশক – জি-লাইভ ২৪ ও খবরওয়ালা।