খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
বাংলা সংস্কৃতির সুবিশাল আকাশে কিছু নক্ষত্র উদিত হয়, যাঁরা নিজেদের সৃষ্টি দিয়ে একটি জাতির ইতিহাস ও চেতনাকে চিরকালের জন্য বেঁধে রাখেন। ফজল-এ-খোদা ছিলেন তেমনই একজন প্রদীপ্ত নক্ষত্র। যাঁর কলম থেকে নিঃসৃত হয়েছে বাঙালির আবেগ, সংগ্রাম আর স্বাধিকার আন্দোলনের অবিনাশী গান “সালাম সালাম হাজার সালাম”। ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি নিবেদিত এই একটি গানই তাঁকে বাংলা গানের ইতিহাসে অমরত্ব এনে দিয়েছে। তবে কেবল গীতিকার হিসেবেই নয়, তিনি ছিলেন একাধারে বীর মুক্তিযোদ্ধা, বিশিষ্ট কবি, ছড়াকার, শিশুসাহিত্যিক, প্রাজ্ঞ সম্পাদক এবং অগ্রগণ্য সাংস্কৃতিক সংগঠক।
১৯৪২ সালের ৯ মার্চ পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার বনগ্রামের এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে ফজল-এ-খোদা জন্মগ্রহণ করেন। প্রগতিশীল ও সাংস্কৃতিক আবহাওয়ায় বেড়ে ওঠার কারণে শৈশব থেকেই সাহিত্যের প্রতি তাঁর অন্যরকম এক টান তৈরি হয়। এই অনুরাগের বশবর্তী হয়েই তিনি পরবর্তীতে দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায়, বিশেষ করে সংগীতের ভুবনে অবিরাম অবদান রেখে গেছেন। দেশাত্মবোধক, আধুনিক, গণসংগীত, লোকসংগীত এবং চলচ্চিত্রের গানসহ সকল ধারায় তাঁর লেখনী ছিল সমান সাবলীল।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে ফজল-এ-খোদা রচনা করেন তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি “সালাম সালাম হাজার সালাম, সকল শহীদ স্মরণে”। এই ঐতিহাসিক গানটিতে সুরের জাদু ছড়ান প্রখ্যাত সুরকার আব্দুল লতিফ এবং পরবর্তীতে একাত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী আব্দুল জব্বারের কণ্ঠে গানটি প্রথম প্রচারিত হয়।
১৯৭১ সালের ১৪ মার্চ গানটি সম্প্রচারের পর তা মুহূর্তের মধ্যে অবরুদ্ধ দেশের আপামর জনতা এবং রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে এক অভূতপূর্ব উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। গানটি হয়ে ওঠে মুক্তিকামী বাঙালির অন্যতম প্রধান রণসংগীত। শুধু তাই নয়, একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাল সময়ে টেলিভিশনে প্রচারিত তাঁর লেখা আরেকটি কালজয়ী গান “সংগ্রাম, সংগ্রাম, সংগ্রাম—চলবে দিনরাত অবিরাম” বাঙালির বুকে প্রতিবাদের নতুন এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জ্বেলে দিয়েছিল।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সেই দুঃসময়ে ফজল-এ-খোদা বাংলাদেশ বেতারে কর্মরত ছিলেন। চারদিকে যখন সামরিক জান্তার কঠোর নজরদারি, ভয় আর স্তব্ধতা, তখন একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তিনি তাঁর ভেতরের দ্রোহকে চেপে রাখতে পারেননি। অসীম সাহসে ভর করে তিনি কাব্যের ভাষায় এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। তিনি লিখেছিলেন—
“ভাবনা আমার আহত পাখির মতো পথের ধুলায় লুটোবে, সাত রঙে রাঙা স্বপ্নবিহঙ্গ সহসা পাখনা গুটোবে— এমন তো কথা ছিল না।”
বিশিষ্ট সুরকার ও শিল্পী বশীর আহমেদের সুর ও কণ্ঠে গীত এই গানটি আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অন্যতম সাহসী এবং বেদনাবিধুর এক দলিল হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।
স্বাধীনতার পর ফজল-এ-খোদার সৃষ্টিশীলতার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। চলচ্চিত্রে তাঁর লেখা গানগুলো শ্রোতাদের দারুণভাবে মুগ্ধ করে। বিশেষ করে মাসুদ পারভেজ পরিচালিত “এপার ওপার” চলচ্চিত্রে তাঁর লেখা “ভালোবাসার মূল্য কত, আমি কিছু জানি না” গানটি সে সময় তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে।
গীতিকবিতার পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের বহু পাঠকপ্রিয় ও দর্শকপ্রিয় অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ বেতারের মুখপাত্র “বেতার বাংলা” পত্রিকার প্রথম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া, শিশুদের সুকুমার বৃত্তি ও মেধার বিকাশের লক্ষ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন দেশজোড়া জনপ্রিয় শিশু-কিশোর সংগঠন “শাপলা শালুক”।
পারিবারিক আবহে ফজল-এ-খোদার যোগ্য সহধর্মিণী ছিলেন বিশিষ্ট লেখিকা মাহমুদা সুলতানা। তাঁদের দাম্পত্য জীবন আলো করে আসেন তিন পুত্র—ওয়াসিফ-এ-খোদা, ওনাসিস-এ-খোদা এবং ওয়েসিস-এ-খোদা।
বাংলা ভাষা, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধিকার আন্দোলন এবং মানবিক মূল্যবোধকে গানের বাণীতে ধরে রাখার অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ২০২৩ সালে এই মহান ব্যক্তিত্বকে মরণোত্তর দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা “একুশে পদক”-এ ভূষিত করে।
২০২১ সালের ৪ জুলাই এই ক্ষণজন্মা শব্দসৈনিক পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরলোকে গমন করেন। জাগতিকভাবে তিনি বিদায় নিলেও, তাঁর সৃষ্টি কোনোদিন মুছে যাবার নয়। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, ততদিন ফজল-এ-খোদা বেঁচে থাকবেন বাঙালির হৃদয়ে, গানে আর প্রতিটি বিজয়ের গৌরবে।