নাম ও কাজের পরিধি বদলে আরও শক্তিশালী হচ্ছে এটিইউ ও সিটিটিসি

দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সন্ত্রাস দমনের কৌশলগত কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। পুলিশের বিশেষায়িত দুটি সন্ত্রাসবিরোধী সংস্থা—অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) এবং কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের নাম পরিবর্তন করার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবর্তন আসছে তাদের কাজের পরিধিতেও। সমসাময়িক বিশ্ব ও দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ঝুঁকির ধরন দ্রুত বদলে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করার পর বিষয়টি জনসমক্ষে আসে।

নতুন নাম ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের প্রস্তাব

পুলিশ সদর দপ্তর (পিএইচকিউ) গত ৭ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠিয়েছে। ওই প্রস্তাবে এটিইউর নাম পরিবর্তন করে ‘স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিট (এসএসইউ)’ করার অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের যুক্তি, বর্তমান সময়ে সহিংস উগ্রবাদের পাশাপাশি নতুন ও বহুমাত্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে, যা মোকাবিলার জন্য আরও বিস্তৃত একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রয়োজন।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ৮ জুন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের কাছে আরেকটি চিঠি পাঠানো হয়। সেখানে ডিএমপির বিশেষায়িত শাখা কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের নাম পরিবর্তন করে ‘স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিট-ডিএমপি (এসএসইউ-ডিএমপি)’ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসেন জানান, ইউনিটগুলোর কার্যকারিতা আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এই সাংগঠনিক পুনর্গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে নাম ও পরিধি বদলালেও সংস্থা দুটির মূল নিরাপত্তাসংক্রান্ত দায়িত্ব আগের মতোই বহাল থাকবে।

জনআস্থা পুনর্গঠন ও আধুনিকায়নের তাগিদ

পুলিশ সদর দপ্তরের মতে, এই নাম পরিবর্তনের পেছনে মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত কিছু কারণ রয়েছে। অতীতে বিভিন্ন অভিযান নিয়ে নানা বিতর্ক বা প্রশ্ন উঠেছিল। নতুন নামে পরিচালিত হলে সংস্থাগুলো সেই নেতিবাচক ইমেজ থেকে বেরিয়ে এসে জনগণের আস্থা নতুন করে অর্জন করতে পারবে।

পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) পক্ষে অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক স্বাক্ষরিত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বর্তমান যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইন্টারনেটের ব্যাপক বিস্তার এবং তথ্যের অবাধ ও দ্রুত প্রবাহের কারণে অপরাধের ধরন পুরোপুরি বদলে গেছে। ফলে প্রচলিত বা পুরোনো ধাঁচের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দিয়ে নতুন যুগের অপরাধ দমন করা অসম্ভব। তাই সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করা এখন সময়ের দাবি।

অতীত প্রেক্ষাপট ও বর্তমান উগ্রবাদের রূপান্তর

২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার গুলশানে হোলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা ঘটে। ওই হামলায় ১৭ জন বিদেশি নাগরিকসহ মোট ২২ জন নিহত হন। সেই নিষ্ঠুর ও নজিরবিহীন ঘটনার পরই দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত সন্ত্রাসবিরোধী বাহিনী গঠনের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হয়। ফলশ্রুতিতে ২০১৭ সালের ৭ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ‘অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট’ (এটিইউ)। বর্তমানে সারা দেশে বিশেষায়িত সন্ত্রাসবিরোধী কাজ পরিচালনাকারী এই সংস্থটিতে অনুমোদিত জনবল রয়েছে ৬২০ জন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রস্তাবে বলা হয়েছে, উগ্রবাদী ও জঙ্গি সংগঠনগুলো এখন আর আগের প্রথাগত পদ্ধতিতে কাজ করছে না। তারা অত্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তি ও কৌশল ব্যবহার করে হামলার পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও তা বাস্তবায়ন করছে। তাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করা।

এসব গোষ্ঠী ধর্মের বিকৃত ও ভুল ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে সমাজের অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর ও দুর্বল মানুষদের উগ্রবাদের দিকে টানছে। শুধু তাই নয়, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে তারা বিভিন্ন গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে, যার উদ্দেশ্য সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করা। একই সঙ্গে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ডিজিটাল মাধ্যমকে লক্ষ্য বানিয়ে তরুণদের মগজ ধোলাই করা হচ্ছে এবং তাদের গোপন ‘স্লিপার সেল’-এ যুক্ত করা হচ্ছে।

বিশ্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে, পরিবর্তিত এই সাইবার ও সামাজিক হুমকি মোকাবিলায় এটিইউকে ‘স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিট’ (এসএসইউ)-এ রূপান্তর করা হলে এর কাজের পরিধি শুধু জঙ্গিবাদ দমনে সীমাবদ্ধ থাকবে না। নতুন কাঠামোতে এটি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, জাতীয় স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং জননিরাপত্তার মতো বিস্তৃত ক্ষেত্রে সরাসরি ভূমিকা রাখবে।

তাছাড়া, ‘স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিট’ নামটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অত্যন্ত পরিচিত এবং সমাদৃত। এই নাম ব্যবহারের ফলে বিদেশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার করা সহজ হবে। পাশাপাশি দেশের অন্যান্য গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে কাজের সমন্বয়ও বাড়বে। পুলিশ সদর দপ্তর স্পষ্ট করেছে যে, এই নাম পরিবর্তন ও অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনের জন্য সরকারের বাড়তি কোনো অর্থ ব্যয় বা নতুন বাজেট বরাদ্দের প্রয়োজন হবে না।

অভ্যন্তরীণ উদ্বেগ ও সক্ষমতার প্রশ্ন

বাইরে থেকে এই উদ্যোগকে ইতিবাচক মনে করা হলেও এটিইউ এবং সিটিটিসির ভেতরে এক ধরনের মৃদু উদ্বেগ ও সংশয় তৈরি হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুই ইউনিটের দুজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা তাদের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।

তাদের মতে, একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও বিশেষায়িত কাজের জন্য এই সংস্থাগুলো তৈরি করা হয়েছিল। এখন যদি তাদের ওপর অতিরিক্ত ও ভিন্নধর্মী সাধারণ দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে তাদের মূল মনোযোগ বা ফোকাস নষ্ট হতে পারে।

এটিইউর এক কর্মকর্তা বলেন, বিশেষায়িত সংস্থাকে বহুমুখী সাধারণ দায়িত্ব দিলে তাদের মূল কাজের সক্ষমতা ও দক্ষতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে সিটিটিসির এক কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, কেবল নাম পরিবর্তন করলেই রাতারাতি কাজের ধরনে কোনো বড় পরিবর্তন আসবে না। তবে ভবিষ্যতে যদি সত্যি সত্যি অতিরিক্ত কাজের বোঝা চাপানো হয়, তাহলে দেশ থেকে জঙ্গিবাদ দমনের যে মূল মিশন, তা ব্যাহত হতে পারে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।