এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬
আজ আমার প্রাণের বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তার প্রতিষ্ঠার ৭২ বছর পূর্ণ করে ৭৩ বছরে পদার্পণ করেছে। এই দিনটি আমার কাছে শুধু একটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়; এটি আমার আত্মপরিচয়ের শিকড়ে ফিরে যাওয়ার দিন, কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন, আবেগে ভেসে ওঠার দিন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এখানেই আমার শিক্ষাজীবনের বিকাশ, রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ, নেতৃত্বের শিক্ষা এবং আন্দোলন-সংগ্রামের হাতেখড়ি। আজ আমি ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে যা কিছু অর্জন করেছি, যে সম্মান, ভালোবাসা ও দায়িত্ব পেয়েছি, তার বড় অংশের ভিত্তি নির্মিত হয়েছে এই প্রিয় বিদ্যাপীঠের বুকে।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় চল্লিশ হাজার শিক্ষার্থীর প্রত্যক্ষ ভোটে পরপর দুইবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু)-এর পত্রিকা সম্পাদক নির্বাচিত হওয়া আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন। শিক্ষার্থীদের সেই আস্থা ও ভালোবাসার ঋণ আমি কখনও শোধ করতে পারব না।
আজও যখন প্রিয় মতিহার চত্বরে পা রাখি, মনে হয় যেন সময় থমকে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি গাছ, প্রতিটি ভবন, প্রতিটি আড্ডাস্থল আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় তারুণ্যের দিনগুলোয়—স্বপ্ন, সংগ্রাম, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, প্রতিবাদ আর সম্ভাবনায় ভরা সেই দিনগুলোর কাছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আমার কাছে কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি আমার হৃদয়ের সবচেয়ে আপন ঠিকানা।

প্রতিষ্ঠার ইতিহাস: দীর্ঘ আন্দোলনের ফসল
উত্তরাঞ্চলে উচ্চশিক্ষার সূচনা হয় ১৮৭৩ সালে রাজশাহী কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। একসময় এখানে স্নাতকোত্তর ও আইন বিভাগ চালু থাকলেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ব বাংলার উত্তরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি প্রবল হয়ে ওঠে।
১৯৫০ সালের ১৫ নভেম্বর স্থানীয় শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ৬৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়ে ১৯৫২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী কলেজে ছাত্রদের বিক্ষোভ এবং ১০ ও ১৩ ফেব্রুয়ারির জনসভা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিকে গণআন্দোলনে রূপ দেয়।
আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ১৫ জন ছাত্রনেতাকে কারাবরণ করতে হলেও জনমতের কাছে শেষ পর্যন্ত সরকার নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। ১৯৫৩ সালের ৩১ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হয় এবং একই বছরের ৬ জুলাই প্রফেসর ইতরাত হোসেন জুবেরী প্রথম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

মতিহার: স্বপ্নের ক্যাম্পাস
প্রথমদিকে রাজশাহী কলেজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। পরে পদ্মার তীরবর্তী বড়কুঠি, লালকুঠি, ফুলার হোস্টেলসহ শহরের বিভিন্ন স্থানে প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালিত হতে থাকে।
পরবর্তীকালে অস্ট্রেলীয় স্থপতি ড. সোয়ানি টমাসের পরিকল্পনায় নির্মিত হয় সবুজে ঘেরা আজকের নান্দনিক মতিহার ক্যাম্পাস। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কার্যক্রম ধীরে ধীরে এখানে স্থানান্তরিত হয়। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য, মুক্ত চিন্তার পরিবেশ এবং জ্ঞানচর্চার অনুকূল আবহ আজও মতিহারকে দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও গৌরবের ইতিহাস
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস কেবল শিক্ষা ও গবেষণার নয়; এটি সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং গণতন্ত্রের ইতিহাসও।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রদের জীবন রক্ষায় নিজের বুক পেতে দিয়ে শহীদ হন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা। একজন শিক্ষক হিসেবে নিজের জীবন উৎসর্গ করার এমন নজির বিশ্ব ইতিহাসেও অত্যন্ত বিরল। তাঁর আত্মত্যাগ গণঅভ্যুত্থানে নতুন গতি এনে দেয় এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথকে আরও সুগম করে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই বিশ্ববিদ্যালয় হারিয়েছে অসংখ্য শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীকে। শহীদ অধ্যাপক হবিবুর রহমান, সুখরঞ্জন সমাদ্দার, মীর আবদুল কাইয়ুমসহ অসংখ্য শহীদের আত্মত্যাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসকে করেছে মহিমান্বিত।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও এই ক্যাম্পাস ছিল অগ্রণী। ১৯৮৪ সালের ২২ ডিসেম্বর আন্দোলনে শহীদ হন মেধাবী ছাত্রনেতা, তৎকালীন জাসদ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ এবং হকার আব্দুল আজিজ। গুলিবিদ্ধ হন রাকসুর সাবেক ভিপি রুহুল কবির রিজভী।
পরবর্তীকালে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদবিরোধী আন্দোলনেও এই বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শহীদ হন ইয়াসির আহমেদ পিটু; গুরুতর আহত ও স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন রিমুসহ আরও অনেকে। তাঁদের আত্মত্যাগ আমাদের গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আমাদের অঙ্গীকার
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; এটি আমাদের ভবিষ্যতের পথনির্দেশক।
আমরা চাই, এই বিশ্ববিদ্যালয় হোক মুক্তচিন্তা, মানবিক মূল্যবোধ, বিজ্ঞানমনস্কতা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের অন্যতম কেন্দ্র। দলীয় সংকীর্ণতা, লুটপাট, সহিংসতা, দুর্নীতি ও অপসংস্কৃতি থেকে মুক্ত হয়ে এটি যেন জ্ঞান, নৈতিকতা ও সৃজনশীলতার আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠে।
শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, অ্যালামনাই এবং প্রশাসন—সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আরও সমৃদ্ধ হবে, বিশ্বমানের শিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

প্রিয় বিদ্যাপীঠ, তোমার কাছে আমার আজীবনের ঋণ। তোমার আলোয় আলোকিত হয়েই আমরা এগিয়ে চলেছি। তোমার গৌরব আমাদের গৌরব, তোমার সম্মান আমাদের সম্মান।
শুভ ৭৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, আমার প্রাণের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
লেখকঃ
এবিএম জাকিরুল হক টিটন
সম্পাদক ও প্রকাশক, খবরওয়ালা, জি-লাইভ
সাবেক পত্রিকা সম্পাদক, রাকসু।