খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ই জুলাই ২০২৬, ৩:২৭ পিএম
শ্রীলঙ্কার একটি কারাগারে কয়েদিদের দুটি পক্ষের মধ্যে ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে চারজন কারারক্ষীসহ অন্তত ২৫ জন নিহত হয়েছেন। এই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন ১০০ জনেরও বেশি বন্দি। দেশটির কারা কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, গত ৫ বছরের মধ্যে এটিই শ্রীলঙ্কার কোনো কারাগারে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী সংঘর্ষের ঘটনা।
স্থানীয় পুলিশের বরাত দিয়ে জানা গেছে, রাজধানী কলম্বোর উত্তরের নেগোম্বো অঞ্চলের প্রধান কারাগারে এই নির্মম সহিংসতার ঘটনাটি ঘটে। মূলত মাদক চক্রের সাথে জড়িত কয়েদিদের দুটি শক্তিশালী ও প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের মধ্যে রোববার রাতভর এই সংঘর্ষ চলে। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক ছিল যে, কয়েদিরা একে অপরের ওপর আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় নেগোম্বো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালটির পরিচালক পুষ্পা গামলাথ আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি-কে জানান, হাসপাতাল চত্বরে আনার আগেই ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। নিহত ও আহতদের প্রায় সবার শরীরেই গুলি এবং ধারালো অস্ত্রের আঘাতের গভীর ক্ষত পাওয়া গেছে।
কারাগারটির অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তারা জানান, রোববার সন্ধ্যার দিকে প্রথম বড় আকারের সংঘর্ষটি শুরু হয়। ভেতরে গোলাগুলি ও ভাঙচুরের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো কারাগার জুড়ে আতঙ্ক দেখা দেয়। নিজের জীবন বাঁচাতে এবং পুরুষ বন্দিদের তাণ্ডব থেকে দূরে থাকতে নারী সেকশনের বহু কয়েদি একপর্যায়ে ভবনের ছাদে উঠে আশ্রয় নেন। কিন্তু ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মানুষের চাপের কারণে ছাদের একটি অংশ হঠাৎ ধসে পড়ে। এই দুর্ঘটনায় বেশ কয়েকজন নারী কয়েদি গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
শ্রীলঙ্কার স্থানীয় গণমাধ্যমে তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বন্দিদের এই দুই পক্ষের মধ্যে মূল বিবাদের সূত্রপাত হয়েছিল রোববার দুপুরেই। দুপুরের ওই প্রাথমিক দফায় সংঘর্ষে দুজন কয়েদি নিহত হন। এরপর কারা কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করতে পারলেও রাতের দিকে তা আবার নতুন করে এবং আরও হিংস্র রূপ নিয়ে শুরু হয়।
পরদিন সোমবার সকালে পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে চারজন কারারক্ষী নিহত হন। এরপর পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং দাঙ্গা থামাতে পুলিশের বিশেষ কমান্ডো বাহিনীকে (এসটিএফ) মাঠে নামানো হয়। বর্তমানে পুরো কারাগার এলাকায় অতিরিক্ত সেনা ও পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। অন্যদিকে, ভেতরে এমন ভয়াবহ সংঘাতের খবর শুনে কারাগারের বাইরে শত শত কয়েদির উদ্বিগ্ন স্বজনরা ভিড় জমিয়েছেন। আশপাশের সাধারণ বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তারা রোববার রাত থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত কারাগারের ভেতর থেকে অনবরত গোলাগুলির শব্দ শুনেছেন।
এর আগে প্রায় ৫ বছর আগে, ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময়ও শ্রীলঙ্কার মাহারা কারাগারে কয়েদিদের সাথে প্রশাসনের ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল, যাতে ১১ জন বন্দি নিহত হন। সেই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর চাপে সরকার অতিরিক্ত ভিড় কমাতে কারাগারগুলো থেকে শত শত কয়েদিকে সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি দিয়েছিল। তবে পরিস্থিতির যে খুব একটা উন্নতি হয়নি, তা বর্তমান পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত রোববার পর্যন্ত দেশটির কারাগারগুলোতে মোট ৪১ হাজার ২৫০ জন বন্দি আটক ছিলেন, যা তাদের আসল ধারণক্ষমতার চেয়ে চারগুণ বেশি। এই মাত্রাতিরিক্ত ভিড় এবং মাদক চক্রের অবাধ বিস্তারের কারণেই লঙ্কান কারাগারগুলো এখন একেকটি টাইম বোমায় পরিণত হয়েছে।
মন্তব্য