খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ই জুলাই ২০২৬, ৭:৫ এএম
জঙ্গিবাদ কেবল একটি নিরাপত্তা সমস্যা নয়; এটি মানবসভ্যতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে পরিচালিত এক গভীর সহিংস চ্যালেঞ্জ। এর লক্ষ্য শুধু নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটানো নয়, বরং সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ সৃষ্টি করা, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা দুর্বল করা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে আঘাত করা এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তোলা। যে সমাজে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, সেখানে অবিশ্বাস, বিভাজন এবং আতঙ্ক ধীরে ধীরে সামাজিক সম্পর্কের ভিতকেও ক্ষয় করে।
বিশ্বের প্রায় প্রতিটি অঞ্চল কোনো না কোনো সময় সহিংস উগ্রবাদের নির্মম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়াও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশও বিভিন্ন সময়ে জঙ্গিবাদের হুমকি ও হামলার শিকার হয়েছে। বিশেষ করে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩টি জেলায় প্রায় একযোগে সংঘটিত বোমা হামলা এবং ২০১৬ সালের ঢাকার হলি আর্টিজান হামলা জাতিকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। এসব ঘটনায় দেশি-বিদেশি বহু নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান, অসংখ্য পরিবার চিরদিনের জন্য শোকাহত হয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
জঙ্গিবাদের জন্ম কখনো একদিনে হয় না। এটি ধীরে ধীরে বিকশিত হয় বিভ্রান্তিকর মতাদর্শ, ঘৃণার রাজনীতি, অনলাইন অপপ্রচার, ষড়যন্ত্রমূলক প্রচারণা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, ধর্মের অপব্যাখ্যা, অসহিষ্ণুতা এবং কখনো কখনো আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের প্রভাবের মাধ্যমে। গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা দেখায়, শুধু নিরাপত্তা অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতা, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত ভূমিকা চরমপন্থা প্রতিরোধে অপরিহার্য।
বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে বহু জঙ্গি নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং হামলার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করা সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে সচেতনতা বৃদ্ধি, সম্প্রদায়ভিত্তিক অংশগ্রহণ এবং প্রতিরোধমূলক উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জঙ্গিবাদ একটি পরিবর্তনশীল হুমকি; তাই আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন উগ্রবাদ, গোপন যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের নতুন নতুন পথও তৈরি হচ্ছে, যা নিয়মিত নজরদারি ও প্রতিরোধের দাবি রাখে।
জঙ্গিবাদের ক্ষতি বহুমাত্রিক। এটি মানুষের নিরাপত্তাবোধ ধ্বংস করে, বিনিয়োগ ও পর্যটনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি দেশের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। কিন্তু সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় মানুষের। একটি বিস্ফোরণ শুধু কয়েকটি প্রাণ কেড়ে নেয় না; ভেঙে দেয় বহু পরিবারের স্বপ্ন, অনিশ্চয়তায় ফেলে দেয় অসংখ্য শিশুর ভবিষ্যৎ এবং সমাজজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ক্ষতের সৃষ্টি করে।
জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচারের নীতিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অপরাধী যে-ই হোক, তার পরিচয়, মতাদর্শ বা অবস্থান নির্বিশেষে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিরপরাধ মানুষ যেন কোনোভাবেই হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। কারণ ন্যায়বিচার এবং আইনের প্রতি মানুষের আস্থা জঙ্গিবাদ প্রতিরোধের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি।
এই লড়াই কেবল অস্ত্রের নয়; এটি চিন্তারও লড়াই। তরুণদের বিজ্ঞানমনস্ক, মানবিক ও সহনশীল মূল্যবোধে গড়ে তোলা, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটানো, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতির চর্চা বৃদ্ধি করা এবং অনলাইনে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা—এসবই দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের অপরিহার্য উপাদান।
আমাদের মনে রাখতে হবে, জঙ্গিবাদের কোনো ধর্ম নেই, কোনো মানবিক আদর্শ নেই, কোনো রাজনৈতিক বা নৈতিক বৈধতাও নেই। এটি কেবল ধ্বংস, বিভাজন এবং মৃত্যুর সংস্কৃতিকে লালন করে। তাই জঙ্গিবাদের প্রতি সামান্য প্রশ্রয়, নীরব সমর্থন কিংবা উদাসীনতাও ভবিষ্যতের জন্য বড় ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে।
একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ, সহনশীল এবং মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। মতের ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান হতে হবে অভিন্ন, সুস্পষ্ট এবং আপসহীন।
জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকতা নয়—কঠোর, আইনসম্মত ও মানবিক প্রতিরোধই সময়ের দাবি। কারণ শান্তি, নিরাপত্তা, মানবিক মূল্যবোধ এবং আইনের শাসনের ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে ওঠে একটি শক্তিশালী, মর্যাদাবান ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র।
মন্তব্য