খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তিনি আগামী ডিসেম্বরে ভারতের অবস্থান থেকে বাংলাদেশে ফিরে এসে আদালতের কাছে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন। তাঁর দাবি, দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাকেও সঙ্গে নিয়ে দেশে ফেরার এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি এ তথ্য জানান।
বৃহস্পতিবার রাতে নেওয়া ওই সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে শুক্রবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার বক্তব্য তুলে ধরা হয়। তিনি বলেন, দেশে ফিরলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি প্রাণনাশের আশঙ্কাও রয়েছে। তা সত্ত্বেও তিনি বাংলাদেশে ফিরতে চান। তাঁর ভাষ্য, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর নিপীড়ন চলছে বলে তিনি মনে করেন এবং জীবনের শেষ পরিণতি যদি অনিবার্য হয়, তবে সেটি নিজের দেশেই হতে চান।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। সেই প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয় এবং তিনি ভারত চলে যান। পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। গত নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। একই সময়ে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দাবি করেন, তিনি এবং তাঁর দলের কয়েকজন নেতা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর মতে, আদালতে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বর্তমান রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের অবস্থান ও বিচারিক প্রক্রিয়া কতটা নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হয়, সেটিও স্পষ্ট হবে।
বাংলাদেশ সরকার এর আগে একাধিকবার ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে। বিষয়টি দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে আলোচিত হয়েছে। তবে শেখ হাসিনা বলেন, দেশে ফেরার বিষয়ে তিনি কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করেননি। তাঁর বক্তব্য, তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ভারত সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে, কিন্তু তিনি নিজ উদ্যোগেই বাংলাদেশে ফিরে আসতে চান।
ভারতে যাওয়ার পর এই প্রথমবারের মতো শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে দেশে ফেরার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার কথা উল্লেখ করলেন। ফলে তাঁর এই ঘোষণাকে দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও একই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের একজন। তবে দেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে তাঁর বা দলের অন্য জ্যেষ্ঠ নেতাদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রকাশ্যে আসেনি। রয়টার্স জানিয়েছে, এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের বিষয়ে মন্তব্য জানতে বাংলাদেশের সরকারের সংশ্লিষ্ট মুখপাত্রদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছিল। তবে প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত তাঁদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় দুই বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বর্তমান সরকার যখন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে, তখন শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরা নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক ও উত্তেজনার জন্ম দিতে পারে। একই সঙ্গে তাঁর ঘোষিত আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা দেশের রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে নতুন আলোচনার সূত্রপাত ঘটাতে পারে। তবে তাঁর দেশে ফেরা, আত্মসমর্পণ কিংবা পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া—সবকিছুই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বাস্তব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ওপর নির্ভর করবে।