খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ই জুলাই ২০২৬, ৭:১৭ এএম
বরিশালের আগৈলঝাড়ায় পুলিশ হেফাজতে এক আসামির মৃত্যুর মিথ্যা গুজবকে কেন্দ্র করে থানায় হামলা, ব্যাপক ভাঙচুর ও পুলিশের ওপর সহিংসতার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার রাতভর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এই ঘটনার পর থেকে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং হামলায় জড়িত অন্য অভিযুক্তদের ধরতেও পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
শুক্রবার (১০ জুলাই) সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আগৈলঝাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মাদ মাসুদ খান। তিনি জানান, সরকারি কাজে বাধা ও থানায় হামলার ঘটনায় জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। অপরাধীদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে কাজ করছে পুলিশ।
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার (৮ জুলাই) রাত পৌনে আটটার দিকে আগৈলঝাড়া উপজেলার বাকাল ইউনিয়নের ফুল্লশ্রী গ্রাম থেকে রিয়াজ ফকির নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একটি চুরির মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে তাকে আটক করা হয়েছিল। এছাড়া তার বিরুদ্ধে আগে থেকেই দুটি মাদক মামলা রয়েছে। থানায় এনে তাকে হাজতখানায় রাখা হলে ওই দিন রাত নয়টার দিকে রিয়াজ হঠাৎ করেই হাজতের ভেতরের লোহার শিকের সঙ্গে নিজের মাথা ঠুকতে শুরু করেন। এতে তিনি মাথায় গুরুতর আঘাত পান এবং একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। বর্তমানে তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
গুজব ও থানায় তাণ্ডব
রিয়াজকে হাসপাতালে পাঠানো হলেও এলাকায় একদল স্বার্থান্বেষী মহল গুজব ছড়িয়ে দেয় যে, পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনে রিয়াজের মৃত্যু হয়েছে। এই মিথ্যা খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে পরদিন বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকেল সাড়ে চারটার দিকে উত্তেজিত একদল গ্রামবাসী লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে থানায় চড়াও হয়। তারা কোনো কিছু না বুঝেই সরাসরি থানার ভেতরে ঢুকে তাণ্ডব চালায়। হামলাকারীরা ডিউটি অফিসারের কক্ষে ঢুকে কম্পিউটারসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র ও সরকারি মালামাল ভাঙচুর করে। এ সময় কর্তব্যরত ডিউটি অফিসার এএসআই আব্দুল হালিমকে নির্মমভাবে মারধর করতে করতে থানার বাইরে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নিলে পুলিশ শৃঙ্খলা ফেরাতে লাঠিচার্জ শুরু করে। এরপরই উভয়পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়।
আহতদের বিবরণ
এই আকস্মিক ও সহিংস সংঘর্ষে পুলিশের ছয় সদস্য এবং রিয়াজের পরিবারসহ অন্তত ছয়জন গ্রামবাসী আহত হয়েছেন। গুরুতর আহত এএসআই আব্দুল হালিমকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এই ঘটনায় আহত ও চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
| ক্র. নং | নাম | পরিচয় | বর্তমান অবস্থা ও চিকিৎসাস্থল |
| ১ | রিয়াজ ফকির | আটক আসামি (ফুল্লশ্রী গ্রাম) | হাজতে নিজের মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল |
| ২ | আব্দুল হালিম | এএসআই (ডিউটি অফিসার), পুলিশ | হামলায় গুরুতর আহত, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল |
| ৩ | লিমন মিয়া | কনস্টেবল, পুলিশ | সংঘর্ষে আহত, চিকিৎসাধীন |
| ৪ | ফরহাদ হোসেন | কনস্টেবল, পুলিশ | সংঘর্ষে আহত, চিকিৎসাধীন |
| ৫ | মনির হোসেন | কনস্টেবল, পুলিশ | সংঘর্ষে আহত, চিকিৎসাধীন |
| ৬ | আল আমিন হোসেন | কনস্টেবল, পুলিশ | সংঘর্ষে আহত, চিকিৎসাধীন |
| ৭ | মেহেদী হাসান | কনস্টেবল, পুলিশ | সংঘর্ষে আহত, চিকিৎসাধীন |
| ৮ | নাছরিন বেগম (৫০) | গ্রামবাসী (রিয়াজের মা) | সংঘর্ষে আহত, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স |
| ৯ | শারমিন আক্তার (২৮) | গ্রামবাসী (রিয়াজের বোন) | সংঘর্ষে আহত, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স |
| ১০ | মমতাজ বেগম (৪৭) | গ্রামবাসী | সংঘর্ষে আহত, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স |
| ১১ | কাঞ্চন ফকির | গ্রামবাসী (রিয়াজের চাচা) | সংঘর্ষে আহত, স্থানীয়ভাবে চিকিৎসাধীন |
ওসির ক্ষোভ ও বক্তব্য
থানায় ঢুকে প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশের ওপর এমন বর্বরোচিত হামলায় গভীর ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন ওসি মোহাম্মাদ মাসুদ খান। তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “থানায় ঢুকে এভাবে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্যাতন চালানো হলে আমরা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য কার কাছে যাব? এই পোশাকের মর্যাদা যদি আমরা রক্ষা করতে না পারি, তবে তা গায়ে রাখব না। পুরো ঘটনা সাধারণ জনগণ ও উপস্থিত সাংবাদিকরা দেখেছেন। আমাদের কোনো একটি তথ্য বা পদক্ষেপ যদি ভুল কিংবা মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তবে আমি নিজে এই পুলিশি পোশাক খুলে ফেলব।”
তিনি আরও বলেন, “মাদক ব্যবসায়ী আর চোরদের প্রশ্রয় দেওয়ার কারণে আজ সমাজের এই দশা। থানায় ঢুকে যেভাবে নির্মমভাবে পুলিশ সদস্যদের মারা হলো, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। যে পুলিশ মানুষকে সেবা দেবে, আজ তারাই বিচারের আশায় দাঁড়িয়ে আছে। এভাবে প্রতি কাজে বাধা পেলে আমাদের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং সঠিক কাজটা করা কঠিন হয়ে পড়বে।”
বর্তমানে আগৈলঝাড়া থানা ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।
মন্তব্য