খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ই জুলাই ২০২৬, ৯:১৭ এএম
আটলান্টা স্টেডিয়াম তখন কাঁপছিল ইংলিশ সমর্থকদের ‘ফুটবল ইজ কামিং হোম’ স্লোগানে। ঘড়ির কাঁটায় ম্যাচের বয়স ৮৪ মিনিট। ১৯৬৬ সালের পর দীর্ঘ খরা কাটিয়ে আরও একটি ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার অপেক্ষায় থ্রি লায়ন্সরা। অথচ কে জানত, পরের সাত মিনিটে আটলান্টার সবুজ ঘাসে রচিত হতে যাচ্ছে এক মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি, আর আর্জেন্টাইন ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে ইংলিশদের সব প্রতিরোধ!
ম্যাচের ৫৫ মিনিটে প্রথম লিড নেয় ইংল্যান্ড। নকআউট পর্ব থেকেই আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের দুর্বলতা চোখে পড়ছিল, আর সেই সুযোগটাই কাজে লাগায় ইংলিশরা। তবে গোল পাওয়ার পর দলটির জার্মান কোচ টমাস টুখেল কৌশল বদলে ফেলেন। ইউরোপের অন্যতম সেরা এই ট্যাকটিশিয়ান আক্রমণাত্মক ফুটবল বাদ দিয়ে রক্ষণাত্মক ‘পার্ক দ্য বাস’ কৌশল বেছে নেন। আর্জেন্টিনা চলতি বিশ্বকাপে এর আগের দুটি নকআউট ম্যাচেও প্রথমে পিছিয়ে পড়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল—এই পরিসংখ্যান জানার পরও রক্ষণে অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি টুখেলের জন্য আত্মঘাতী প্রমাণিত হয়।
টুখেলের ডিফেন্স মন্ত্র যে টেকসই নয়, তা বুঝতে ফুটবলপ্রেমীদের ১০ মিনিটের বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি। লিওনেল মেসি ও লাউতারো মার্টিনেজের একের পর এক ধারালো আক্রমণে ইংলিশ ডিফেন্স লাইন ভেঙে পড়তে শুরু করে। জর্ডান পিকফোর্ড একবার নিশ্চিত গোললাইন সেভ না করলে এবং অন্য একটি শট পোস্টে লেগে ফিরে না এলে ব্যবধান আগেই কমত।
৮৪ মিনিট পার হওয়ার পর যখন ইংলিশরা ফাইনালের ক্ষণগণনা শুরু করেছে, ঠিক তখনই নিজেদের চেনা রূপে ফেরে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা। চলতি বিশ্বকাপে মিশর ও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে একদম শেষ মুহূর্তে ম্যাচ বের করে আনার যে রেকর্ড আলবিসেলেস্তেরা গড়েছিল, ঐতিহাসিকভাবে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তা যেন আরও দ্বিগুণ শক্তিতে রূপ নেয়।
ম্যাচের ৮৫ মিনিটে দৃশ্যপট বদলে দেন এনজো ফার্নান্দেজ। বক্সের ঠিক সামনে থেকে নেওয়া তাঁর দুর্দান্ত কোনাকুনি শট ইংলিশ ডিফেন্ডারদের ফাঁকি দিয়ে জালে জড়ায়। পিকফোর্ড ডানদিকে ঝাঁপিয়েও বলের নাগাল পাননি। সমতায় ফেরার পর উজ্জীবিত আর্জেন্টিনা যেন আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে, অন্যদিকে পুরোপুরি ভেঙে পড়ে ইংল্যান্ডের মনোবল।
নির্ধারিত সময়ের ঠিক শেষ মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ডান প্রান্ত থেকে বল নিয়ে বক্সে নিখুঁত এক ক্রস বাড়ান অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ইংলিশ ডিফেন্ডাররা শূন্যে লাফিয়েও সেই বলের নাগাল পাননি, তবে ফাঁকায় থাকা লাউতারো মার্টিনেজ কোনো ভুল করেননি। দারুণ এক হেডে বল জালে জড়িয়ে তিনি স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজারো আর্জেন্টাইন সমর্থককে উল্লাসে ভাসান। মাত্র সাত মিনিটের ব্যবধানে ম্যাচ সম্পূর্ণ আর্জেন্টিনার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
রেফারি ইনজুরি সময় দিয়েছিলেন ৯ মিনিট। এই বিশ্বকাপে শেষ মুহূর্তে গোল করে ম্যাচ বাঁচানোর উদাহরণ থাকলেও, ইংল্যান্ড সেই চেষ্টাটুকুও করতে পারেনি। উল্টো শেষ সময়েও মেসি ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিলেন এবং বেশ কয়েকটি গোলের সুযোগ তৈরি করেছিলেন।
রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথে মাঠেই উল্লাসে ফেটে পড়েন আর্জেন্টাইন ফুটবলাররা। ৩৯ বছর বয়সে এসেও পুরো ম্যাচ জুড়ে যে ফুটবল শৈলী মেসি দেখালেন, তা এক কথায় অনন্য। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ক্যারিয়ারের প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমেই জোড়া গোলের নেপথ্য নায়ক বনে গেলেন তিনি। ডিফেন্সের ভুলে গোল হজম করলেও শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনালে কখনো না হারার অজেয় রেকর্ড ধরে রাখল আর্জেন্টিনা। ফকল্যান্ড যুদ্ধ কিংবা ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ ইতিহাসের কারণে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই জয় আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে যোগ করল আরও একটি সোনালী অধ্যায়।
মন্তব্য