খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান দমনে আওয়ামী লীগ সরকারের দমন-পীড়নের ঘটনায় রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া হত্যা ও হত্যাচেষ্টার বেশ কয়েকটি মামলার তদন্তে মারাত্মক সব অসঙ্গতি ও জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। পুলিশের জমা দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য, যেখানে দেখা যাচ্ছে মামলার বাদী সম্পূর্ণ ভুয়া, আবার কোথাও ‘নিহত’ দাবি করা ব্যক্তি আসলে জীবিত এবং বর্তমানে বিদেশে কর্মরত রয়েছেন।
ব্যক্তিগত শত্রুতা, জমি-সংক্রান্ত বিরোধ কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থে নিরীহ মানুষকে ফাঁসাতে জুলাই আন্দোলনের শহীদদের নাম ও ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে এসব মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর হাতিরঝিলের উলন সড়ক এলাকায় আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে ৪৬ বছর বয়সী মো. বাবু নিহত হয়েছেন বলে আদালতে একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাকর্মী এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আসামি করা হয়। এজাহারে বাদী হিসেবে স্বাক্ষর ছিল নিহত বাবুর খালাতো ভাই পরিচয় দেওয়া ইসমাঈল নামে এক ব্যক্তির।
২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর আদালতে জমা দেওয়া মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে হাতিরঝিল থানা পুলিশ জানায়, বাবুর দেওয়া জাতীয় পরিচয়পত্রের ঠিকানা ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে জানা গেছে, কথিত নিহত ‘বাবু’ আসলে জীবিত। তার আসল নাম মো. শাকিল এবং তিনি বর্তমানে সৌদি আরবে কর্মরত। হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলে সৌদি আরব থেকে একটি ভয়েস মেসেজে শাকিল বলেন:
“আমি তো মারা যাইনি ভাই। আমি মরলে সৌদি আরব এলাম কীভাবে? পুলিশও এ বিষয়ে আমার সঙ্গে আগে কথা বলেছে। আমি এখন সৌদি আরবে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছি।”
তদন্তে আরও দেখা যায়, মামলার বাদী হিসেবে উল্লেখ করা ইসমাঈলের পরিচয়ও ভুয়া। ফরিদগঞ্জে ইসমাঈলের সন্ধান মিললে তিনি তদন্ত কর্মকর্তাকে জানান, তিনি এ ধরনের কোনো মামলা করেননি এবং আদালতে উপস্থিত হয়েও তিনি একই জবানবন্দি দেন। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রাসেল ইসলাম জানান, মামলায় সংযুক্ত করা মৃত্যুসনদটি সম্পূর্ণ জাল ছিল। অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে একটি স্বার্থান্বেষী চক্র অসৎ উদ্দেশ্যে এই মিথ্যা মামলাটি দায়ের করেছে।
একই ধরনের আরেকটি ঘটনা ঘটেছে পল্টন থানায়। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই পল্টনের বক্স কালভার্ট সড়কে হামলায় পারভেজ আলী (২৪) নামে এক যুবক নিহত এবং মামলার বাদী ইয়াসিন আরাফাত নিজে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন দাবি করে ২ সেপ্টেম্বর একটি মামলা দায়ের করা হয়। এ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসসহ আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট নেতাদের আসামি করা হয়।
মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্ত শেষে পিবিআই জানায়, ‘পারভেজ আলী’ নামে নিহত কোনো ব্যক্তির অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি। এছাড়া বাদী ইয়াসিন আরাফাতের গুলিবিদ্ধ হওয়ার দাবিও সম্পূর্ণ মিথ্যা।
তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের এসআই মো. মাসুদ রানা জানান, ইয়াসিন আরাফাতের পায়ে কোনো একসময় পড়ে গিয়ে বা আঁচড় লেগে কেটে যাওয়ার একটি দাগ ছিল, সেটাকেই তিনি গুলিবিদ্ধ হওয়ার চিহ্ন হিসেবে দেখিয়েছিলেন। এমনকি তার বাবাও ছেলের গুলিবিদ্ধ হওয়ার বিষয়ে কিছু জানতেন না এবং আরাফাত কোনো মেডিকেল সনদও দেখাতে পারেননি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই মামলায় আসামি করা হয়েছিল পাবনার দুই ট্রাকচালক আব্দুল মতিন ও নাজমুল হাসানকে (চাচা-ভাতিজা)। তাদের গ্রামের বাড়ি পাবনায় এবং বাদীর বাড়ি সাতক্ষীরায়। কোনো পরিচয় না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তারা আসামি হলেন, জানতে চাইলে আব্দুল মতিন বলেন, তাদের প্রতিবেশী কাশেম মুন্সির সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। কাশেমের এক ভাতিজা ঢাকায় ক্যামেরাম্যান হিসেবে কাজ করেন এবং তিনি মামলার বাদী আরাফাতের বন্ধু। মূলত এই ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকেই তাদের আসামি করা হয়েছিল। পিবিআই আসামিদের মোবাইল ফোনের কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) যাচাই করে নিশ্চিত হয়েছে যে, ঘটনার দিন তারা পাবনাতেই ছিলেন, ঘটনাস্থলে নয়।
অনুরূপভাবে আদাবর থানায় দায়ের হওয়া আরেকটি হত্যা মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সেটিকে মিথ্যা বলে উল্লেখ করেছে পুলিশ। এজাহারে বলা হয়েছিল, ১৯ জুলাই আদাবরে হামলায় আলী মিয়া নামে এক ব্যক্তি নিহত হন এবং মো. তোহা খান এর বাদী।
তদন্তে নেমে পুলিশ কথিত নিহত আলী মিয়ার কোনো সঠিক ঠিকানা বা পরিচয় পায়নি। এমনকি এজাহারে দেওয়া বাদীর মোবাইল নম্বরটি বন্ধ এবং আদাবরের ঠিকানায় তোহা খান নামে কারও কোনো অস্তিত্ব মেলেনি। আদাবর থানার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই তরুণ কুমার জানান, ঘটনাটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন পরবর্তীতে এক দফার গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিলে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। জাতিসংঘের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী এই আন্দোলনে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হওয়ার ধারণা দেওয়া হলেও সরকারি গেজেটে নিহতের সংখ্যা সাড়ে আটশ’র কাছাকাছি।
বিশাল এই গণঅভ্যুত্থানের পর ঢাকাসহ সারা দেশে ঢালাও মামলার বন্যা বয়ে যায়। নিচে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী মামলার চিত্র তুলে ধরা হলো:
মোট মামলার সংখ্যা (অগাস্ট ২০২৪ পর্যন্ত): ৭০৭টি (রাজধানীর ৫০টি থানায়)
মোট আসামির সংখ্যা: ৫,০৭৯ জন
সর্বাধিক মামলা হওয়া থানা: যাত্রাবাড়ী থানা (১৯টি)
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মামলা: পল্টন মডেল থানা (১৬টি)
অন্যান্য প্রধান থানাগুলোর মামলা: উত্তরা পূর্ব, পশ্চিম, বিমানবন্দর ও দক্ষিণখান মিলিয়ে ১৩টি; হাতিরঝিল ও ভাটারা থানায় ৭টি করে; রামপুরা থানায় ৫টি।
বর্তমানে তদন্তাধীন মামলা: ১২৬টি
আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া মামলা: ১৯টি (যার মধ্যে ৩টি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ১৬টিতে গুরুতর অসঙ্গতি ও ভুয়া তথ্য রয়েছে)।
ঢালাও ও মিথ্যা মামলার কারণে প্রকৃত শহীদদের রক্তের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। মিথ্যা মামলার বাদীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন:
“যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে মামলাটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ভুয়া, তবে দণ্ডবিধির ২১১ ধারা অনুযায়ী মিথ্যা অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অন্যের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা ফৌজদারি মামলা করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যদিও আমাদের দেশে এমন ব্যবস্থা নেওয়ার নজির কম, তবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে এটি করা জরুরি। এই ধরনের ভুয়া মামলা বিচারকদের মনেও একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যা পরে প্রকৃত ভুক্তভোগীদের বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে।”
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, আইন অনুযায়ী ভুয়া বাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে এবং পুলিশ যথাযথ পদক্ষেপ নেবে। তবে জুলাই অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত এই পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যদি বিশেষ কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়, তবে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।