খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
খুলনায় চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক কিশোরী নির্জনা (১৬) হত্যাকাণ্ডের জট অবশেষে পুরোপুরি খুলেছে। নিজের মেয়েকে হত্যার পর বস্তাবন্দি করে লাশ গুম করার কথা স্বীকার করে এবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বাবা আকাশ। রোববার (১৯ জুলাই ২০২৬) বিকেলে খুলনা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১ এর বিচারক মো. আসাদুর জামান তাঁর এই জবানবন্দি রেকর্ড করেন। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে আদালত তাঁকে করাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এর আগে, শনিবার (১৮ জুলাই) দুপুর আড়াইটার দিকে ডুমুরিয়া উপজেলার স্থানীয় একটি বাজারের চায়ের দোকান থেকে র্যাব ও খুলনা সদর থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে আকাশকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এই ঘটনার বেশ কয়েক দিন আগে, গত ১০ জুলাই নির্জনার মা আরিফা ইয়াসমিন সীমাও নিজের মেয়েকে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে অনুরূপ জবানবন্দি দিয়েছিলেন। মা-বাবা উভয়ের জবানবন্দির মধ্য দিয়ে এই নিষ্ঠুর পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের সব বিবরণ এখন প্রকাশ্যে এসেছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও খুলনা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আমিনুল ইসলাম জানান, শনিবার দুপুরে আকাশকে গ্রেপ্তারের পর থানা হেফাজতে নিয়ে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি খুনের বিবরণ এবং লাশ লুকানোর বিষয়ে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য দেন। এরপর রোববার সকালে আকাশ নিজে থেকেই আদালতে জবানবন্দি দিতে সম্মতি প্রকাশ করলে দুপুরের পর তাঁকে কড়া নিরাপত্তায় ম্যাজিস্ট্রেটের খাস কামরায় হাজির করা হয়।
পুলিশের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র এই পারিবারিক কলহ ও হত্যাকাণ্ডের করুণ বিবরণ তুলে ধরেছে। জানা গেছে, গত ৮ জুলাই সকাল ১০টার দিকে নিজের স্বামী রনির সাথে চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে নগরীর বসুপাড়া বাঁশতলা এলাকার বাড়ি থেকে বের হয়েছিল নির্জনা। বিষয়টি টের পেয়ে পরিবারের সদস্যরা তাকে রাস্তা থেকে জোর করে ধরে বাসায় নিয়ে আসেন। ওই দিন বিকেলে মা আরিফা ইয়াসমিন সীমার সাথে নির্জনার তীব্র কথা কাটাকাটি হয়। উত্তেজনার একপর্যায়ে নির্জনা তার মায়ের গায়ে হাত তোলে এবং এক হাত দিয়ে মায়ের গলা টিপে ধরে। এই দৃশ্য দেখে বাবা আকাশ পাশে থাকা কাঠের চলা (লাকড়ি) দিয়ে মেয়েকে শাসন করতে যান। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই কাঠের আঘাতটি সরাসরি নির্জনার মাথায় গিয়ে লাগে। মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর মা-বাবা তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহ্বল হয়ে আকাশ ও সীমা আইনি ঝামেলা এড়াতে লাশ গুম করার পরিকল্পনা করেন। আকাশ একটি কালো রঙের লুঙ্গি দিয়ে মেয়ের নিথর দেহটি শক্ত করে বাঁধেন। এরপর ছাদ থেকে আনা একটি বড় প্লাস্টিকের বস্তায় লাশটি ভরে দোতলা থেকে নিচে নামিয়ে আনেন। নিজের মোটরসাইকেলের পেছনে সেই বস্তাবন্দি লাশ বেঁধে বিভিন্ন রাস্তায় ঘুরতে থাকেন আকাশ। কোন নির্জন জায়গায় লাশটি ফেলবেন, তা বুঝতে না পেরে দীর্ঘক্ষণ শহরের এমাথা-ওমাথা ঘোরেন। শেষমেশ শহরতলির প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার একটি সুনসান ও অন্ধকার সড়কে বস্তাটি ফেলে তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। ঘরে ফিরে স্বামী-স্ত্রী মিলে মেঝেতে লেগে থাকা রক্তের দাগ ধুয়ে মুছে সাফ করেন। ওই রাতে দুজনেই নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনেক কান্নাকাটি করলেও পরদিন সকালেই তারা বাড়ি তালাবদ্ধ করে পালিয়ে যান।
খুলনা সদর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “সড়কের পাশে ফেলে যাওয়া অজ্ঞাত ও বস্তাবন্দি লাশটি উদ্ধারের পর প্রাথমিক অবস্থায় আমরা খুনের কোনো কূলকিনারা পাচ্ছিলাম না। পিবিআই এবং সিআইডি দলও প্রথম দিকে মেয়েটির পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি। এ নিয়ে পুরো পুলিশ প্রশাসন চরম উদ্বেগের মধ্যে ছিল। পরে ঘটনার দিন রাতেই আমরা লাশের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিই। এর পরের দিন বিকেলে তার আসল পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়।”
ওসি আরও জানান, তদন্তের সবচেয়ে সন্দেহজনক দিকটি ছিল মেয়ের মৃত্যুর পর থেকে মা-বাবার মোবাইল ফোন বন্ধ থাকা এবং তাদের উধাও হয়ে যাওয়া। এরপর গোয়েন্দা নজরদারি ও আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় প্রথমে মা সীমাকে আটক করে থানায় আনা হয়। শুরুতে তিনি নির্বাক থাকলেও পরে জিজ্ঞাসাবাদের মুখে সব সত্য স্বীকার করেন। ঘটনার ৬ দিন পর হত্যাকাণ্ডে এবং লাশ বহনে ব্যবহৃত আকাশের সেই মোটরসাইকেলটি জব্দ করা হয়। আর ঘটনার ১০ দিনের মাথায় ডুমুরিয়ার চায়ের দোকান থেকে পালিয়ে থাকা আকাশকে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয় পুলিশ।