খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
প্রায় নয় বছর আগে রাজধানীর মধ্য বাড্ডায় স্ত্রী শাকির খাতুন সোমাকে হত্যার দায়ে মনির হোসেনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. সাদেকীন হাবীব এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার আগে কারাগার থেকে আসামি মনির হোসেনকে আদালতে হাজির করা হয়। রায় শেষে তাঁর বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করে পুনরায় কারাগারে পাঠানো হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে আলোচিত এই হত্যা মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে এবং আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ সন্তুষ্ট।
মামলার নথি ও আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মনির হোসেন ও শাকির খাতুন সোমার বিয়ে হয় ২০০৩ সালে। তাঁদের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। বিয়ের পর একপর্যায়ে ব্যবসার জন্য অর্থের প্রয়োজনের কথা বলে স্ত্রীর পরিবারের কাছে টাকা দাবি করতে থাকেন মনির। অভিযোগ রয়েছে, টাকা দেওয়ার পরও সোমার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধ হয়নি। বিভিন্ন সময়ে সোমার পরিবারের পক্ষ থেকে মনিরকে প্রায় ১১ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
তবে ওই অর্থ দেওয়ার পরও আরও টাকার দাবিতে সোমার ওপর নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ করেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্যাতনের একপর্যায়ে সোমাকে তাঁর বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে আর নির্যাতন করা হবে না—এমন আশ্বাস দিয়ে তাঁকে আবার নিজের বাসায় ফিরিয়ে আনেন মনির। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এরপরও দাম্পত্য কলহ ও নির্যাতনের পরিস্থিতির অবসান হয়নি।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ৬ অক্টোবর দুপুরে টাকা-পয়সা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে মনির ছুরি দিয়ে সোমার গলায় আঘাত করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় সোমার চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসেন। পরে তাঁকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার দিনই নিহত সোমার মা মোছা. আক্তার বানু বাদী হয়ে বাড্ডা থানায় হত্যা মামলা করেন। পরে পুলিশ মনির হোসেনকে গ্রেপ্তার করে। মামলার তদন্তের সময় তিনি আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
তদন্ত শেষে ২০১৭ সালের ৭ ডিসেম্বর বাড্ডা থানার পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। এরপর ২০১৮ সালের ১৭ মে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয় এবং মামলাটির আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়।
বিচার চলাকালে মামলায় মোট ২০ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৫ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন। তাঁদের সাক্ষ্য, মামলার অন্যান্য নথি এবং উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে আদালত মনির হোসেনকে স্ত্রী হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেন।
আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মামলার বিচার চলাকালে মনির দীর্ঘ সময় জামিনে ছিলেন। গত ১৪ জুলাই মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হলে আদালত রায় ঘোষণার জন্য আজকের দিন ধার্য করেন। একই দিন তাঁর জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে নির্ধারিত দিনে আদালত তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড ও এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন।
প্রায় নয় বছর ধরে চলা এই মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে সোমা হত্যার বিচারিক কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হলো। তবে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর আইন অনুযায়ী আসামির আপিল ও অন্যান্য বিচারিক সুযোগ থাকার বিষয়টিও প্রযোজ্য হবে।