চুরির অপবাদে নির্যাতন, ছয় দিন পর রংমিস্ত্রির মৃত্যু
খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় চুরির অপবাদ দিয়ে এক রংমিস্ত্রিকে দুই দিন আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধারের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর নয়ন হাওলাদার নামে ওই রংমিস্ত্রির মৃত্যু হয়েছে। সোমবার দিবাগত রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
মঙ্গলবার দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেন ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুব আলম। তিনি জানান, নিহতের স্ত্রী আমেনা আক্তার শিমু বাদী হয়ে এ ঘটনায় মামলা করেছেন। মামলায় চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্য আসামিদেরও গ্রেফতারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, চুরির অপবাদ দিয়ে নয়নকে নির্যাতন করার সময় তার ওপর যে ধরনের শারীরিক নিপীড়ন চালানো হয়েছে, তাতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করলেও শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু হয়।
নিহতের স্ত্রী আমেনা আক্তার শিমু জানান, তারা স্বামী-স্ত্রী নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল তাতখানা এলাকায় শাহজালালের খালার বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। নয়ন পেশায় রংমিস্ত্রি ছিলেন। ঘটনার আগে প্রায় এক মাস ধরে তিনি ফতুল্লার দক্ষিণ শিহাচর এলাকার নুরুল ইসলামের বাড়িতে রং করার কাজ করছিলেন।
শিমুর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিনের মতো গত ১৪ জুলাই সকালে নয়ন কাজে যাওয়ার জন্য নুরুল ইসলামের বাড়িতে যান। সেদিন রাতে নুরুল ইসলাম ফোন করে তাকে জানান, নয়নের বিরুদ্ধে ঘর থেকে ৫০ হাজার টাকা চুরির অভিযোগ রয়েছে। টাকা ফেরত দিলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে বলেও জানানো হয়।
স্বামীকে ছাড়িয়ে আনতে পরদিন শিমু নিজের কানের স্বর্ণের দুল বন্ধক রেখে ৩০ হাজার টাকা সংগ্রহ করেন। তার অভিযোগ, ওই টাকা দেওয়ার পরও নয়নকে ছেড়ে দেওয়া হয়নি। বরং নুরুল ইসলামের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা ক্ষিপ্ত হয়ে নয়নের বুকের ওপর বসে কাঠের টুকরো দিয়ে আঘাত করেন। একই সময়ে বাড়ির আরেক সদস্য সিরাজুস সালেকিন বিদ্যুতের তার ব্যবহার করে নয়নের শরীরে বৈদ্যুতিক শক দেন এবং তার বাম হাতের কবজি ও আঙুল মুচড়িয়ে দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শিমু আরও জানান, নির্যাতনের একপর্যায়ে নয়ন নিথর হয়ে পড়েন। তখন তিনি তাকে হত্যা না করার জন্য অভিযুক্তদের কাছে কান্নাকাটি করে অনুরোধ করেন। কিন্তু এরপরও নুরুল ইসলাম বাকি ২০ হাজার টাকা এনে দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন।
স্বামীর জীবন নিয়ে শঙ্কিত হয়ে শিমু শেষ পর্যন্ত জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করেন। তার ফোন পেয়ে ১৬ জুলাই দুপুরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে নুরুল ইসলামকে গ্রেফতার করে এবং গুরুতর আহত নয়নকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে ছয় দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর সোমবার দিবাগত রাতে তার মৃত্যু হয়।
ফতুল্লা মডেল থানার ওসি মাহবুব আলম বলেন, নয়নকে নুরুল ইসলাম তার বাড়িতে দুই দিন আটকে রেখে মারধর করেছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। ঘটনার সময় পুলিশকে জানানো হলে তাকে আরও আগেই উদ্ধার করা সম্ভব হতো বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে মামলা করেছেন এবং মামলার চার আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পলাতক আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
এদিকে স্বামীর চিকিৎসার পেছনে ধারদেনা করে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও তাকে বাঁচাতে না পারার আক্ষেপ জানিয়েছেন শিমু। তার অভিযোগ, মিথ্যা চুরির অপবাদে তার স্বামীকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। তিনি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছেন।
ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কোনো ব্যক্তিকে চোর সন্দেহে আটকে রেখে নির্যাতন করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কারও বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ থাকলে বিষয়টি পুলিশকে জানিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে কাউকে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ নেই। নয়নের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ এখন মামলার তদন্ত, আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের ভূমিকা খতিয়ে দেখছে।