খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
নিয়ম মেনে স্কুলের ঘণ্টা বাজে, শিক্ষার্থীরা ক্লাস শেষে স্বাভাবিক নিয়মে বাড়ি ফেরে। উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে এক বছর আগে ঘটে যাওয়া বিভীষিকাময় স্মৃতি এখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছে অনেক শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবককে।
২০২৫ সালের ২১ জুলাই সোমবার সকালটা ছিল একদমই সাধারণ। কলেজের প্রজেক্ট-২ ভবনের প্রতিটি কক্ষে তখন চলছিল পাঠদান। তৃতীয় শ্রেণির ক্লাসরুমে বসে ছিল শিশু শিক্ষার্থীরা। পরনে ইউনিফর্ম আর বইভরা ব্যাগ। এক হাতে খাতা, অন্য হাতে কলম। দুপুর ১টায় ছুটি হয়। বিমান বাহিনীর এফ-৭ বিজেআই প্রশিক্ষণ বিমানটি ঢাকার বিমান বাহিনী ঘাঁটি বীর-উত্তম এ কে খন্দকার থেকে বেলা ১টা ৬ মিনিটে উড্ডয়ন করে। ১টা ১৮ মিনিটে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার আলী একাডেমিক ভবনে বিধ্বস্ত হয়।
বিধ্বস্ত প্লেনটি ছিটকে প্রাইমারি শিক্ষার্থীদের ভবনের সিঁড়ির সামনে চলে যায়। বিধ্বস্ত হওয়া বিমানটির ‘নাক’ ঢুকে যায় ভবনের সিঁড়ির অংশে, আর এর দুই পাখার আঘাতে পুড়ে ছাই হয় শিশুদের দুটি ক্লাসরুম। এক মুহূর্তে পালটে যায় সব কিছু, হতবিহ্বল ও দিশাহারা হয়ে শিক্ষার্থীদের দিগ্বিদিক ছুটোছুটি, চিত্কার, কান্না, ধোঁয়া, ধুলোয় ভরে যায় স্কুল। স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। এর মধ্য থেকে একের পর এক দগ্ধ শিক্ষার্থী বের করে আনা হয়। মুহূর্তেই প্রাণচঞ্চল ক্যাম্পাস পরিণত হয়েছিল ধ্বংসস্তূপে। দুর্ঘটনায় পাইলট, এক শিক্ষিকা এবং ২৮ শিক্ষার্থীসহ মোট ৩৬ জনের প্রাণহানি ঘটে। আহত হন আরও বহু শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারী।
ঘটনার পর আহতদের রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গুরুতর দগ্ধদের চিকিৎসা চলে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। দীর্ঘ চিকিৎসার পর অনেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও, তাদের শরীরে রয়ে গেছে পোড়া ক্ষতের চিহ্ন এবং মনে সেই দিনের ভয়াবহ স্মৃতি। আগুনে পুড়ে কয়েকজন নিহতের মরদেহ বিকৃত হয়ে যাওয়ায় প্রথমে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পাঁচজনের পরিচয় নিশ্চিত করে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করে।
ভয়াবহ সেই স্মৃতি আজও ভুলতে পারছেন না প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীরা। দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাইমুল হাসান আদিত সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জানান, দুর্ঘটনার মুহূর্তে তিনি ওই ভবনের মাত্র ১০০ মিটার দূরে ছিলেন। চোখের সামনে বিকট শব্দে ভবনটি বিধ্বস্ত হতে এবং সহপাঠীদের অঙ্গার হয়ে যেতে দেখেছেন তিনি। ওই ঘটনার পর দীর্ঘদিন রাতে ঘুমের ঘোরে আঁতকে উঠতেন আদিত। সন্তানের মানসিক অবস্থা দেখে অভিভাবকরা তাকে অন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতে চাইলেও সহপাঠীদের স্মৃতির টানে তিনি এই স্কুলেই থেকে গেছেন।
দুর্ঘটনার সময় যে ভবনে বিমানটি আছড়ে পড়ে, সেখানেই ছিল চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী রুবাইদা নূর আলভীরা। দুর্ঘটনায় আহত হয়ে তাকে দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। বর্তমানে সে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। আলভীরা জানায়, ঘটনার পর দীর্ঘ সময় সে ট্রমার মধ্যে ছিল। হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পর দুর্ঘটনার স্মৃতি তাকে বেশি কষ্ট দিত। বর্তমানে অনেকটাই স্বাভাবিক হলেও সেই দিনটির কথা এখনও মনে পড়ে। সে জানায়, দুর্ঘটনার পর তাকে দুই মাস সাত দিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। পরে স্কুল খুললে আবার নিয়মিত ক্লাসে ফিরেছে। এখন আর স্কুলে ভয় লাগে না, তবে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের কথা এখনও মনে পড়ে। আলভীরা বলে, দুর্ঘটনায় হারানো বন্ধুদের মধ্যে আয়মানের কথা তার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। তার সঙ্গে অনেক কথা হতো, কিন্তু এখন সে আর নেই।
এই দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাভিদ নাওয়াজ দীপ্তর চিকিৎসা দেশজুড়ে আলোচনায় আসে। শরীরের ৪৫ শতাংশ পুড়ে যাওয়া দীপ্তকে ৯৭ দিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। এ সময়ে তার ৩৬টি অস্ত্রোপচার ও আটবার স্কিন গ্রাফটিং করা হয়। চিকিৎসকদের নিরলস প্রচেষ্টায় তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও, তার দীর্ঘ চিকিৎসা এই ট্র্যাজেডির এক অনন্য সংগ্রামের প্রতীক হয়ে আছে।
অভিভাবকরা বলেন, আহত শিক্ষার্থীরা সবকিছুতেই এখন বিরক্ত দেখায়, হঠাৎ রেগে যায়। আকাশে বিমানের আওয়াজ শুনলে এখনো অনেকে আতঙ্কে শিউরে ওঠে ও কান চেপে ধরে। বেশির ভাগই ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারছে না, আবার কেউ মাঝ রাতে ঘুমের মধ্যে কেঁদে উঠছে।
দুর্ঘটনায় সন্তান হারানো পিতামাতাদের জীবনে প্রতিটি মুহূর্ত যেন এক একটি দীর্ঘ যুগের সমান। সকালে যখন আশপাশের শিশুরা কাঁধে ব্যাগ নিয়ে স্কুলে রওয়ানা হয়, তখন সন্তানহারা মা-বাবারা ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে অশ্রু ফেলেন। স্বজনদের মতে, সরকার ঘোষিত ২০ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতিপূরণ তাদের সন্তানের অভাব কোনোদিনই পূরণ করতে পারবে না। তাই অনেক পরিবারই সরকারের দেওয়া সেই অর্থ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
এক বছর পেরিয়ে গেলেও নিহতদের স্বজন, আহত শিক্ষার্থী এবং মাইলস্টোন পরিবারের কাছে ২১ জুলাই এখনও শোক, বেদনা ও না-ভোলা এক বিভীষিকার দিন। দুঃখজনক হলেও বিমানবাহিনী এখনও বিধ্বস্ত বিমানটি স্কুলের পাশেই রেখে দিয়েছে যা শিক্ষার্থী ও অবিভাবকদের সেই বিভিষিকাময় দিনটির কথা বারবার মনে করিয়ে দেয়।