খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লিতে শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ আন্দোলন এখন কেবল শিক্ষাঙ্গনে সীমাবদ্ধ নেই। প্রশ্নপত্র ফাঁস, দুর্নীতি, বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি এবং সরকারের জবাবদিহিতার দাবিতে ফুঁসে উঠেছেন দেশটির তরুণ সমাজ। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের একটি নাগরিক ও সামাজিক উদ্যোগের অধীনে গড়ে ওঠা এই সর্বাত্মক আন্দোলন দিন দিন তীব্র রূপ নিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই তরুণ আন্দোলন ভবিষ্যতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের জন্য বড় ধরনের রাজপথের চাপ ও রাজনৈতিক বিপদঘণ্টা হয়ে উঠতে পারে।
সম্প্রতি রাজধানীর যন্তর মন্তর এলাকায় সংসদ ভবন অভিমুখে ডাকা আন্দোলনকারীদের পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সকাল থেকেই নতুন দিল্লির প্রধান সড়ক ও বিভিন্ন এলাকা অবরুদ্ধ করে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থী তরুণ-তরুণী সমবেত হন। আন্দোলন ঠেকাতে পুলিশ কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে মেট্রো রেল চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে এবং সংসদ ভবনের আশপাশে ১৪৪ ধারা বা পথ চলাচলে বাধা তৈরি করে। তা সত্ত্বেও ব্যারিকেড ভেঙে প্রগতিশীল ছাত্র ও তরুণরা যন্তর মন্তরে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করলেও বিক্ষোভকারীদের হটাতে পারেনি।
মূলত নিট-ইউজি (NEET-UG) সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বারবার ফাঁস হওয়া এবং মূল্যায়ন কারচুপির ঘটনার প্রতিবাদে সিজেপি বেশ কিছুদিন ধরে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে আসছে। আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি হলো— পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ব্যর্থতার দায় নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের তাৎক্ষণিক পদত্যাগ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো রাজনৈতিক দল নয়; এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জন্ম নেওয়া তরুণদের একটি স্বতঃস্ফূর্ত নাগরিক উদ্যোগ। সামাজিক মাধ্যমে লাখ লাখ তরুণের সমর্থন পাওয়া এই প্ল্যাটফর্মটি এখন রাজপথের প্রতিবাদেও বিশাল জনসমাগম ঘটাতে সক্ষম হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ভারত সরকার আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা আন্দোলনরত তরুণদের প্রতিনিধিদলের সাথে বৈঠকে বসেন এবং প্রবাসীরা তথা শিক্ষার্থীরা একটি লিখিত স্মারকলিপি পেশ করেন। তবে আন্দোলনকারীদের মূল দাবিগুলোর বিষয়ে এখনও কোনো স্পষ্ট সরকারি সিদ্ধান্ত না আসায় রাজপথের কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি। বিখ্যাত পরিবেশকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনাম ওয়াংচুক প্রবাসীদের এই প্রতিবাদের সমর্থনে অনশন পালন করায় আন্দোলন আরও এক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের মতে, তরুণদের এই স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ মোদি সরকারের জন্য একটি বড় বার্তা। পুলিশি বাধা, দূরযোগাযোগ বন্ধ এবং চরম প্রতিকূলতা সত্ত্বেও যেভাবে তরুণসমাজ রাস্তায় নেমে এসেছে, তা প্রমাণ করে শিক্ষা ও কর্মসংস্থান ইস্যুতে ক্ষোভ কতটা গভীরে পৌঁছেছে। গণপ্রজাতান্ত্রিক কাঠামোয় দেশের সাধারণ মানুষের জীবনজীবিকা ও ভবিষ্যতের দাবিকে দীর্ঘমেয়াদে উপেক্ষা করা অসম্ভব— সিজেপির আন্দোলন ভারতীয় রাজনীতিতে সেই বাস্তবতাই নতুন করে স্পষ্ট করে তুলল।