রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। সংবিধান অনুযায়ী তাঁর পদত্যাগের ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ায় নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে শপথ গ্রহণ না করা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। পদত্যাগপত্র গ্রহণের পর বিকেল পাঁচটায় জাতীয় সংসদ ভবনে সংবাদ সম্মেলনের আহ্বান জানিয়েছেন স্পিকার।
বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর দায়িত্ব হস্তান্তরের বিষয়ে স্পষ্ট বিধান রয়েছে। সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষরযুক্ত একটি পত্রের মাধ্যমে স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারেন। আর ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময়সীমাও সংবিধানে নির্ধারিত রয়েছে। ১২৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
বর্তমান জাতীয় সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থীর পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কয়েক দিন ধরেই আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তবে দলটির পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নাম ঘোষণা করা হয়নি।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দিনই চিকিৎসা শেষে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক থেকে দেশে ফেরেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। গত ১৯ জুলাই চিকিৎসার উদ্দেশ্যে তিনি ব্যাংককে গিয়েছিলেন। পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী তাঁর আগামী রোববার দেশে ফেরার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগেই তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন।
দুপুর সোয়া ১২টার দিকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকেরা রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগ সম্পর্কে জানতে চাইলে স্পিকার তখন বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তাঁর কোনো তথ্য নেই। তিনি জানান, দেশের বাইরে থাকায় এ বিষয়ে তিনি অবগত নন। একই সঙ্গে তিনি সংবিধানের বিধান তুলে ধরে বলেন, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছেই জমা দিতে হবে এবং সে ক্ষেত্রে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
গত কয়েক দিন ধরেই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সম্ভাব্য পদত্যাগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছিল। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, তিনি পদত্যাগের বিষয়ে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, পদত্যাগের আগের দিন তিনি বঙ্গভবনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে বিদায়ের প্রস্তুতির বিষয়েও আলোচনা করেন।
মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সে সময় তাঁকে পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়েছিল এবং তাঁর মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত থাকার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় পৌনে দুই বছর আগেই তিনি পদত্যাগ করলেন।
২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই রাষ্ট্রপতি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিনের অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক ও আলোচনা অব্যাহত ছিল। পরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করলে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক জল্পনা আরও তীব্র হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁর পদত্যাগের মাধ্যমে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।
এখন সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদ নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবে। নতুন রাষ্ট্রপতি শপথ গ্রহণ না করা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করবেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এ সময় রাষ্ট্র পরিচালনার সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সংবিধানে নির্ধারিত সব বিধান কার্যকর থাকবে।