খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
হলিউডের অস্কারজয়ী প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ক্রিস্টোফার নোলান বিশ্ব চলচ্চিত্রে ভারতীয় উপমহাদেশের স্বতন্ত্র ধারার প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা ও মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন। এবার আন্তর্জাতিক এই ক্ষণজন্মা নির্মাতাকে আচ্ছন্ন করেছেন বিশ্ববরেণ্য বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত ‘ক্রাইটেরিয়ন ক্লোজেট’ পরিদর্শনের সময় সত্যজিৎ রায়ের বিশ্বখ্যাত ‘অপু ট্রিলজি’র বিশেষ সংগ্রাহক সংস্করণ নিজের ঝুলিতে যুক্ত করেন নোলান। এ সময় এই ট্রিলজির প্রথম চলচ্চিত্র ‘পথের পাঁচালী’র অভূতপূর্ব নির্মাণশৈলীর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে তিনি জানান, সিনেমাটি তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত ও অভিভূত করেছে।
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে ‘ক্রাইটেরিয়ন কালেকশন’ অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি নাম। বিশ্বের মানসম্মত ও কালজয়ী প্রায় এক হাজারেরও বেশি ক্লাসিক চলচ্চিত্রের বিশাল সম্ভার রয়েছে তাদের এই বিশেষ আর্কাইভ বা ‘ক্রাইটেরিয়ন ক্লোজেট’-এ। বিশ্বমানের পরিচালক, অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলীরা নিয়মিত এখানে আসেন, তাদের নিজস্ব ভাবনাকে সমৃদ্ধ করা সিনেমাগুলো নির্বাচন করেন এবং সেগুলো নিয়ে নিজেদের অনুভূতি ব্যক্ত করেন।
সম্প্রতি ক্রাইটেরিয়ন কালেকশনের অফিসিয়াল ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে ক্রিস্টোফার নোলানকে তাক থেকে পরম যতনে চলচ্চিত্র বাছাই করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে তিনি সত্যজিৎ রায়ের ‘অপু ট্রিলজি’ বক্স সেটটি হাতে নেন এবং আবেগভরে নিজের অনুভূতি শেয়ার করেন।
নোলান বলেন,
“এটি ভারতের অন্যতম দূরদর্শী নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের অমর সৃষ্টি ‘অপু ট্রিলজি’। এই ট্রিলজির সূচনা ঘটেছিল ‘পথের পাঁচালী’ চলচ্চিত্র দিয়ে, যা সত্যিই এক বিস্ময়কর নির্মাণ। এটি রীতিমতো আমার দেখার অভিজ্ঞতাকে নতুন রূপ দিয়েছে এবং আমাকে অভিভূত করেছে। ট্রিলজির বাকি দুটি সিনেমা এখনও দেখার সুযোগ হয়নি, তাই পুরো সংগ্রহটি সাথে নিয়ে গল্পটি শেষ করার জন্য আমি অত্যন্ত ব্যাকুল ও রোমাঞ্চিত।”
১৯৫৫ সালে রূপালী পর্দায় আলোর মুখ দেখেছিল সত্যজিৎ রায়ের প্রথম পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘পথের পাঁচালী’। কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি এই বাংলা চলচ্চিত্রে অবিভক্ত গ্রামীণ বাংলার এক অসচ্ছল পরিবারের যাপনচিত্র, প্রকৃতির বৈচিত্র্য এবং ছোট্ট অপুর শৈশব ও বেড়ে ওঠার হৃদয়স্পর্শী গল্প ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। নিপুণ ও সহজ কাব্যিক আবেগ, নিখুঁত অভিনয় এবং চরম বাস্তবমুখী চিত্রায়নের দরুন সিনেমাটি কান চলচ্চিত্র উৎসবসহ দেশ-বিদেশের নানা আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিরল সম্মাননা অর্জন করে। বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাস পর্যালোচনায় আজও এটিকে সর্বকালের অন্যতম সেরা সৃষ্টি হিসেবে গণ্য করা হয়। নোলানের নির্বাচিত এই ট্রিলজির পরবর্তী দুই কিস্তি হলো ১৯৫৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘অপরাজিত’ এবং ১৯৫৯ সালের ‘অপুর সংসার’।
দক্ষিণ এশীয় অঞ্চল ও এর সংস্কৃতি নিয়ে ক্রিস্টোফার নোলানের অনুরাগ নতুন কিছু নয়। এর আগেও নিজের চলচ্চিত্র শুটিং ও প্রচারণার স্বার্থে একাধিকবার ভারতে এসেছিলেন এই পরিচালক। সম্প্রতি তার আইম্যাক্স প্রযুক্তির মহাকাব্যিক সিনেমা ‘দ্য ওডিসি’-এর প্রচারণায় তিনি ভারত সফর করেন, যা ছিল দেশটিতে তার তৃতীয় আনুষ্ঠানিক সফর। ‘ইনসেপশন’, ‘ইন্টারস্টেলার’, ‘ডানকার্ক’ কিংবা ‘ওপেনহাইমার’-এর মতো বিজ্ঞাননির্ভর ও জটিল আখ্যানের জন্য সমাদৃত নোলানের কণ্ঠে সত্যজিৎ রায়ের মতো নির্ভেজাল বাস্তবতাবাদী নির্মাতার এই ভূয়সী প্রশংসা বাংলা সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্রের বিশ্বজনীন আবেদনকে আবারও নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।