খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
বাংলা গানের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাঁদের সৃষ্টি সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে আজও মানুষের হৃদয়ে অনুরণিত হয়। কান্তকবি রজনীকান্ত সেন তাঁদেরই একজন। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় কিংবা অতুলপ্রসাদ সেনের মতো বিপুল সংখ্যক গান রচনা না করলেও তাঁর গানের সহজ-সরল ভাষা, হৃদয়ছোঁয়া সুর, গভীর ভক্তি, স্বদেশপ্রেম এবং মানবিক আবেদন তাঁকে বাংলা সংগীতের এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে।
১৮৬৫ সালের ২৬ জুলাই সিরাজগঞ্জ জেলার ঐতিহাসিক ভাঙাবাড়ি গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা গুরুপ্রসাদ সেন ছিলেন বিচারক (মুন্সেফ থেকে পরবর্তীতে সাব-জজ) এবং নিজেও একজন কবি। মাতা মনোমোহিনী দেবী ছিলেন ধর্মপ্রাণ ও সংস্কৃতিমনা।
শৈশব থেকেই রজনীকান্তের মন পড়াশোনার চেয়ে বেশি আকৃষ্ট ছিল গান ও সুরের জগতে। অল্প বয়সেই তিনি দক্ষ বাঁশিবাদক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর সঙ্গীতজীবনের অন্যতম প্রেরণা ও শিক্ষক ছিলেন বন্ধু তারকেশ্বর চক্রবর্তী। তিনি নিজেও ছিলেন একজন সুমধুর কণ্ঠের গায়ক।
কলকাতার সিটি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর আইনশাস্ত্রে পড়াশোনা করেন এবং রাজশাহীতে ওকালতি শুরু করেন। কিন্তু পেশার পাশাপাশি সাহিত্য ও সংগীতই ছিল তাঁর জীবনের প্রকৃত সাধনা। বিভিন্ন সাহিত্যসভা ও সাংস্কৃতিক আসরে তিনি গান গেয়ে ও কবিতা আবৃত্তি করে শ্রোতাদের মুগ্ধ করতেন।
১৯০২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বাণী’। পরবর্তীতে প্রকাশিত হয় ‘কল্যাণী’ ও ‘অমৃত’। জীবদ্দশায় তাঁর তিনটি এবং মৃত্যুর পরে আরও পাঁচটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। তাঁর রচিত গানের সংখ্যা প্রায় তিনশো, যার মধ্যে রয়েছে ভক্তিমূলক, দেশাত্মবোধক, হাস্যরসাত্মক এবং জীবনঘনিষ্ঠ অসংখ্য কালজয়ী গান।
তাঁর ভক্তিমূলক গানগুলোতে ঈশ্বরের প্রতি এক নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের সুর ধ্বনিত হয়েছে। অন্যদিকে দেশাত্মবোধক গানগুলোতে জেগে উঠেছে পরাধীন জাতির আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।
রজনীকান্ত সেন ছিলেন বঙ্গভঙ্গবিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের এক অনুপ্রেরণাদায়ী কণ্ঠ। ১৯০৫ সালের আন্দোলনের উত্তাল সময়ে বিদেশি বস্ত্র বর্জনের আহ্বান জানিয়ে তিনি রচনা করেন অমর গান—
“মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই…”
এই গান মুহূর্তেই বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। সাধারণ মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে আত্মমর্যাদা, দেশপ্রেম ও স্বদেশচেতনার এক অবিনাশী প্রতীক।
জীবনের শেষ প্রান্তে তিনি দুরারোগ্য গলার ক্যানসারে আক্রান্ত হন। অসহনীয় শারীরিক যন্ত্রণার মধ্যেও তাঁর ঈশ্বরবিশ্বাস, মানসিক দৃঢ়তা এবং সৃষ্টিশীলতা এক মুহূর্তের জন্যও থেমে যায়নি। অসুস্থতার সময় তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর—যা বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের ইতিহাসে এক আবেগঘন অধ্যায় হয়ে আছে।
১৯১০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর মাত্র ৪৫ বছর বয়সে তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর গান আজও বাঙালির হৃদয়ে অনুরণিত হয়—ভক্তিতে, দেশপ্রেমে, মানবিকতায় এবং আত্মমর্যাদার চেতনায়।
বাংলা গানের এই অনন্য পথিকৃৎ, কান্তকবি রজনীকান্ত সেনের জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও বিনম্র প্রণাম। তাঁর অমর সৃষ্টি যুগে যুগে আমাদের প্রেরণা জোগাক।