খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে কয়েক সপ্তাহের চরম সামরিক উত্তেজনার পর অবশেষে কিছুটা নমনীয় অবস্থান নিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। উভয় পক্ষের এই আপাত সাময়িক ক্ষান্ত দেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। এক ধাক্কায় অপরিশোধিত তেলের দাম ৫ শতাংশেরও বেশি কমেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের তীব্র মূল্যস্ফীতিতে ভোগা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য একটি সাময়িক স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে।
সোমবার এশিয়ার বাজারে লেনদেন শুরু হওয়ার পর থেকেই তেলের বাজারে দরপতনের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯১.৮৭ ডলারে নেমে এসেছে। উল্লেখ্য, গত দুই সপ্তাহের সশস্ত্র সংঘাতের ধারাবাহিকতায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমা অতিক্রম করেছিল। তবে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের তৎপরতায় কূটনৈতিক আলোচনার পরিবেশ তৈরি হওয়ার সংকেত মিলতেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে, যার সরাসরি প্রতিফলন ঘটেছে বাজারে।
মার্কিন সামরিক সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে ইরানের অভ্যন্তরে শেষ দফায় হামলা চালানোর পর থেকে নতুন করে আর কোনো বিমান অভিযান পরিচালনা করা হয়নি। অন্যদিকে, গত শুক্রবারের পর থেকে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে কোনো পাল্টা আক্রমণ চালায়নি। জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ রোববার জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে কোনো সামরিক আগ্রাসনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কূটনীতি ও আলোচনার সুযোগ দিতে চান।
জ্বালানি তেলের এই দরপতন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও স্বস্তিদায়ক। সামনেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন, যেখানে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্য কঠিন লড়াই চালাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব সাধারণ ভোক্তা ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর তীব্রভাবে পড়েছে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলেছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায়।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস ও ফোকালডাটার যৌথ জরিপে দেখা গেছে, নিবন্ধিত মার্কিন ভোটারদের মাত্র ৩৬ শতাংশ প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের সার্বিক কার্যক্রমে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। জরিপটি ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রত্যক্ষ সংঘাত শুরু হওয়ার ঠিক আগে পরিচালনা করা হয়েছিল, ফলে বর্তমান বাস্তবতায় জনমত আরো বেশি সংবেদনশীল।
মোটরচালকদের প্রভাবশালী সংগঠন ‘এএএ’-এর প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সংঘাত শুরুর পূর্বে ফেব্রুয়ারির শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় দাম ছিল ৩ ডলারের নিচে। তবে সংঘাতের প্রভাবে তা লাফিয়ে বেড়ে ৪.১১ ডলারে গিয়ে পৌঁছায়। জ্বালানির এই ঊর্ধ্বগতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪.১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে—যা দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডারেল রিজার্ভ’-এর নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার দ্বিগুণেরও বেশি।
মূল্যস্ফীতির এই অস্বাভাবিক চাপ সামাল দিতে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী কমিটি ‘ফেডারেল ওপেন মার্কেট কমিটি’ (এফওএমসি) তাদের আগামী বৈঠকে সুদের হার বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বের সাথে আলোচনা করবে। গত বছরের শেষভাগ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নীতিনির্ধারণী সুদের হার ৩.৫০ থেকে ৩.৭৫ শতাংশের ঘরে অপরিবর্তিত রয়েছে।
সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা: ‘সিএমই গ্রুপ’-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা কিছুটা কমে ৩৬.৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের কার্যদিবসে ছিল ৩৭.৪ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতামত: আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক ‘বার্কলেজ’-এর প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ জোনাথন মিলার মনে করেন, তেলের দাম দীর্ঘমেয়াদে উচ্চপর্যায়ে থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণে বাধ্য হতে পারে। তবে সাম্প্রতিক এই দরপতনের ফলে কমিটি আপাতত সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
| সূচক / বিষয় | সংশ্লিষ্ট উপাত্ত ও তথ্য |
| ব্রেন্ট ক্রুডের বর্তমান দর | ব্যারেলপ্রতি ৯১.৮৭ ডলার |
| সর্বশেষ দরপতনের হার | ৫ শতাংশের বেশি |
| সংঘাত চলাকালীন সর্বোচ্চ দর | ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের উপরে |
| যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমান পেট্রলের গড় দাম | গ্যালনপ্রতি ৪.১১ ডলার |
| সংঘাতের পূর্বে পেট্রলের দাম | গ্যালনপ্রতি ৩ ডলারের নিচে |
| যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান মূল্যস্ফীতি | ৪.১ শতাংশ |
| ফেডারেল রিজার্ভের লক্ষ্যমাত্রা | ২.০ শতাংশ |
| বর্তমান নীতিনির্ধারণী সুদের হার | ৩.৫০% – ৩.৭৫% |
| ট্রাম্পের প্রতি জনসন্তোষের হার | ৩৬ শতাংশ (জরিপ অনুযায়ী) |
| সুদের হার বৃদ্ধির আনুমানিক সম্ভাবনা | ৩৬.৩ শতাংশ |
তেলের দাম সাময়িকভাবে কমলেও বিশ্লেষকরা এখনই অতিরিক্ত আশাবাদী হতে নিষেধ করছেন। বিশ্বভিত্তিক ফাইন্যান্সিয়াল ফার্ম ‘আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটস’-এর বৈশ্বিক পণ্যকৌশল বিভাগের প্রধান হেলিমা ক্রফট সতর্ক করে বলেছেন যে, সামরিক সংঘাত সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল খুব দ্রুত স্বাভাবিক হবে না।
তাছাড়া, লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী ও সৌদি আরবের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান নতুন উত্তেজনা জ্বালানি পরিবহনে আরও নতুন জটিলতা তৈরি করছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথগুলো দিয়ে বিশ্বমানের তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূ-রাজনীতি পুরোপুরি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত তেলের বাজারে অস্থিরতার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।