খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
জ্বালানি ছাড়া উড়োজাহাজে চেপে পুরো পৃথিবী ঘুরে আসার ঘটনাটি একসময় কাল্পনিক মনে হলেও, আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রকৃতির শক্তির মেলবন্ধনে তা এখন বাস্তব। কোনো প্রথাগত বা জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যতিরেকে কেবল সূর্যালোককে কাজে লাগিয়ে বিশ্বভ্রমণ সম্পন্ন করে ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়েছে সম্পূর্ণ সৌরচালিত বিমান ‘সোলার ইমপালস–২’ (Solar Impulse 2)। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে অবতরণের মাধ্যমে সফল ইতি ঘটে এই মহাকাব্যিক অভিযাত্রার। এই যুগান্তকারী সাফল্য পরিচ্ছন্ন শক্তি (Clean Energy) এবং পরিবেশবান্ধব বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে এক অনন্য মাইলফলক স্থাপন করেছে।
সোলার ইমপালস-২ বিমানটির বিশ্বভ্রমণ মিশনটি মূলত বাণিজ্যিক কোনো উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়নি। বরং আধুনিক উন্নত প্রকৌশল, অত্যন্ত হালকা উপাদানের ব্যবহার এবং নবায়নযোগ্য শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আকাশপথে হাজার হাজার মাইল পথ অতিক্রম করা যে সম্ভব—বিশ্ববাসীর কাছে তা প্রমাণ করাই ছিল এই প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য।
২০১৫ সালের ৯ মার্চ আবুধাবি থেকে এই ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়। পুরো বিশ্ব পরিভ্রমণে বিমানটিকে মোট ১৬টি বিরতি বা স্টপেজ নিতে হয়েছিল। আকাশপথে বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মুখোমুখি হতে হওয়ায় নিরাপদ উড্ডয়নের স্বার্থে চালকদের অনেক সময় দীর্ঘ বিরতি নিতে হয়। ফলে ২০১৫ সালের মার্চে শুরু হওয়া যাত্রা শেষ হতে সময় লেগেছিল প্রায় ১৬ মাস।
সোলার ইমপালস-২ বিমানের প্রযুক্তিগত নকশা ছিল বিমান প্রকৌশলবিদ্যার এক বিষ্ময়কর নিদর্শন। বোয়িং ৭৪৭-এর চেয়েও বিশাল ডানা থাকা সত্ত্বেও এর ওজন ছিল একটি সাধারণ যাত্রীবাহী গাড়ির সমান। কম শক্তিতে বাতাসে ভেসে থাকার সুবিধার্থে বিমানটির কাঠামো তৈরি করা হয় অত্যন্ত হালকা উপকরণ দিয়ে।
সৌরকোষ ও ব্যাটারি: বিমানটির বিশালাকার ডানায় ১৭ হাজারের বেশি সৌরকোষ (Solar Cells) বসানো ছিল। এগুলো দিনের বেলা সরাসরি সূর্যালোক থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করত।
ইঞ্জিন ও রাতে উড্ডয়ন: দিনে সংগৃহীত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যাটারিতে জমা রাখা হতো। রাতে যখন সূর্যালোক থাকত না, তখন সেই সঞ্চিত শক্তিতে চারটি ইলেকট্রিক ইঞ্জিন সচল রেখে উড্ডয়ন অব্যাহত রাখা হতো।
গতি ও উচ্চতা: বিমানটি দ্রুতগতির চেয়ে শক্তি সঞ্চয় ও কার্যকারিতার ওপর বেশি জোর দিয়ে তৈরি করা হয়। আকাশপথে এটি সর্বোচ্চ ৯ হাজার মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম ছিল এবং এর সর্বোচ্চ গতি ছিল ঘণ্টায় ৯০ কিলোমিটার।
সুইজারল্যান্ডের দুই প্রখ্যাত অভিযাত্রী ও পাইলট—বার্ট্রান্ড পিকার্ড এবং আন্দ্রে বোর্শবার্গ—পর্যায়ক্রমে বিমানটি পরিচালনা করেন। একাকী সংকীর্ণ ককপিটে টানা কয়েক দিন বসে থেকে বিশাল প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসমুদ্র পাড়ি দেওয়া ছিল অত্যন্ত ঝুঁকি ও কষ্টসাধ্য। এর জন্য প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির পাশাপাশি চালকদের মানসিক স্থিতিশীলতা ও সর্বোচ্চ ধৈর্যশক্তির প্রয়োজন ছিল।
অভিযাত্রী বার্ট্রান্ড পিকার্ড এই সফর সম্পর্কে বলেন:
“আমরা মহাসমুদ্রের মুখোমুখি হয়েছিলাম। এটি কেবল বিমান বা প্রযুক্তির পরীক্ষা ছিল না, আমাদের নিজস্ব মানসিক দৃষ্টিভঙ্গিও গড়ে তুলতে হয়েছিল। সোলার ইমপালস কেবল বিমান চলাচলের ইতিহাসে নয়, শক্তির ইতিহাসেও নতুন পথ দেখিয়েছে।”
| সোলার ইমপালস-২ সংক্রান্ত তথ্য ও বিবরণ | বিস্তারিত পরিসংখ্যান / তথ্য |
| বিমানের নাম | সোলার ইমপালস–২ (Solar Impulse 2) |
| অভিযাত্রী/পাইলটবৃন্দ | বার্ট্রান্ড পিকার্ড ও আন্দ্রে বোর্শবার্গ (সুইজারল্যান্ড) |
| যাত্রার শুরুর স্থান ও তারিখ | আবুধাবি, সংযুক্ত আরব আমিরাত (৯ মার্চ, ২০১৫) |
| সমাপ্তির স্থান ও তারিখ | আবুধাবি, সংযুক্ত আরব আমিরাত (জুলাই, ২০১৬) |
| মোট অতিক্রান্ত দূরত্ব | প্রায় ৪০,০০০ কিলোমিটার |
| মোট উড্ডয়ন সময় (Flight Duration) | প্রায় ৫০০ ঘণ্টা |
| মোট বিরতি সংখ্যা (Stops) | ১৬টি |
| মোট কত সময় লেগেছিল | ১৬ মাস |
| সৌরকোষের (Solar Cells) সংখ্যা | ১৭,০০০-এর বেশি |
| সর্বোচ্চ উড্ডয়ন উচ্চতা | ৯,০০০ মিটার |
| সর্বোচ্চ গতিসীমা | ঘণ্টায় ৯০ কিলোমিটার |
| ইঞ্জিনের ধরন ও সংখ্যা | ৪টি ইলেকট্রিক ইঞ্জিন (সৌর বিদ্যুতে চালিত) |
বিশ্বভ্রমণ সম্পন্ন করাই এই দূরদর্শী প্রকল্পের শেষ গন্তব্য ছিল না। আবুধাবিতে অবতরণের পর পিকার্ড ও বোর্শবার্গ বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য শক্তি প্রযুক্তির প্রসার এবং কার্বন নির্গমন কমানোর লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন। বিভিন্ন দেশের সরকারকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য তাঁরা আন্তর্জাতিক পরিষদের মতো উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
সোলার ইমপালস-২ প্রমাণ করেছে যে ভবিষ্যতে দূরপাল্লার পরিবহনে ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণ ছাড়াই সবুজ প্রযুক্তি ব্যবহার সম্ভব। এর ওপর ভিত্তি করেই বিজ্ঞানীরা আশা করছেন যে নিকট ভবিষ্যতে স্বল্প ও মাঝারি দূরত্বের আকাশপথে যাত্রীবাহী বৈদ্যুতিক বিমানের বাণিজ্যিক ব্যবহার বাস্তবে রূপ নেবে।