খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
বিশ্বকাপের মেগা ফাইনাল পরিচালনা করার ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় রেফারিং ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন স্লাভকো ভিনচিচ। স্লোভেনিয়ান ফুটবল ফেডারেশন এক অফিসিয়াল বিবৃতির মাধ্যমে এই খবর নিশ্চিত করেছে।
এক সপ্তাহ আগেই অতিরিক্ত সময়ের টানটান উত্তেজনায় ফেরান তোরেসের জয়সূচক গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে স্পেন। সেই হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা শেষে যোগ করা সময়ে চেলসি মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজকে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠছাড়া করেন ভিনচিচ। ম্যাচটি শেষ হওয়ার পরপরই মাঠে বেশ কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য দেখা যায়, যেখানে আর্জেন্টিনার লিয়ান্দ্রো পারেদেস স্পেনের গাভিকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেন। এ ঘটনায় পারেদেসকে রেফারি তাত্ক্ষণিকভাবে কোনো কার্ড না দেখালেও বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে ফিফা।
ফাইনালের আগেই সংবাদের শিরোনামে এসেছিলেন স্লোভেনিয়ার এই কর্মকর্তা। ফিফা যখন আনুষ্ঠানিকভাবে ফাইনাল পরিচালনার জন্য তার নাম ঘোষণা করে, তখন আবেগ ধরে রাখতে না পেরে আনন্দে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন ভিনচিচ। মাঠের অনন্য নৈপুণ্যের স্বীকৃতিস্বরূপ আন্তর্জাতিক ফুটবল ইতিহাস ও পরিসংখ্যান ফেডারেশন (আইএফএফএইচএস) তাকে এবারের বিশ্বকাপের সেরা রেফারি হিসেবে ভূষিত করে। একই সাথে ইতালিয়ান রেফারিদের সংগঠন এআইএ তাকে প্রদান করে বিশ্বকাপ কিংবা ইউরোর সেরা কর্মকর্তাকে দেওয়া মর্যাদাপূর্ণ ও দ্বিবার্ষিক জুলিও কাম্পানাতি পুরস্কার।
এবারের ফুটবল বিশ্বকাপে সব মিলিয়ে মোট চারটি ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ভিনচিচ। গ্রুপ পর্বে ব্রাজিল-মরক্কো ও জর্ডান-আলজেরিয়া ম্যাচের পাশাপাশি শেষ ষোলোর মেক্সিকো-ইকুয়েডর দ্বৈরথ সামলেছেন তিনি। শেষ ষোলোর ম্যাচটিতে মুখ ঢেকে কথা বলার নতুন নিয়ম অমান্য করায় ইকুয়েডরের পিয়েরো হিনকাপিয়েকে লাল কার্ড দেখান এই রেফারি। আর সবশেষে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ফাইনাল ম্যাচের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পায় তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।
২০১৯ সাল থেকে উয়েফার এলিট রেফারি প্যানেলের নিয়মিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন ভিনচিচ। এর আগে ইউরো ২০২০ এবং ২০২৪ সালের ইউরোতে স্পেন-ইতালি হাই-ভোল্টেজ সেমিফাইনাল সফলভাবে পরিচালনা করেন তিনি। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলের বাইরে ক্লাব ফুটবলেও তার সাফল্য ছিল ঈর্ষণীয়। ভিনচিচের ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় সাফল্য ২০২৪ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল, যেখানে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডকে ২-০ গোলে হারিয়ে রেকর্ড ১৫তম শিরোপা ঘরে তোলে রিয়াল মাদ্রিদ। এছাড়া ২০২২ সালের ইউরোপা লিগ ফাইনাল (রেঞ্জার্স বনাম আইনট্রাখট ফ্রাঙ্কফুর্ট) পরিচালনা করার পাশাপাশি ২০২১ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও ভিয়ারিয়ালের মধ্যকার ইউরোপা লিগ ফাইনালে চতুর্থ রেফারি হিসেবে দায়িত্ব সামলেছেন।
২০২৫ সালে তুর্কি সুপার লিগের বহুল আলোচিত ও উত্তপ্ত গালাতাসারাই বনাম জোসে মরিনিওর ফেনারবাচে ম্যাচটি পরিচালনার দায়িত্বও দেওয়া হয়েছিল তাকে। এছাড়া ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও তিনি দুটি ম্যাচে রেফারির বাঁশি বাজান, যার একটি ছিল আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সেই ঐতিহাসিক জয়।
স্লোভেনিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের বিবৃতি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, চলতি মৌসুমটিকে শুরু থেকেই ভিনচিচের ক্যারিয়ারের ‘বিদায়ী মৌসুম’ হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। অর্থাৎ, ফাইনাল ম্যাচের শেষদিকের কোনো বিতর্ক বা সমালোচনার জেরে তড়িঘড়ি করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বরং বিশ্বমঞ্চের সেরা আসরটিকে নিজের ক্যারিয়ারের শেষ ধাপ হিসেবে আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন তিনি। আইএফএফএইচএসের দেওয়া বর্ষসেরা রেফারির খেতাব এবং জুলিও কাম্পানাতি সম্মাননা যেন তার দীর্ঘ ও সফল ক্যারিয়ারের যোগ্য স্বীকৃতি হয়েই রইল।
২০১২ সালের ইউরোতে ষষ্ঠ রেফারি হিসেবে নিজের আন্তর্জাতিক যাত্রা শুরু করেছিলেন ভিনচিচ। গত ১৪ বছরের সুদীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে ইউরোপিয়ান ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার শীর্ষ দুই ক্লাব প্রতিযোগিতায় তিনি রেকর্ড ৭২টি ম্যাচ পরিচালনা করেছেন। অবশেষে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চ বিশ্বকাপ ফাইনাল পরিচালনার মাধ্যমেই রেফারিং জীবনের সফল যবনিকা টানলেন এই স্লোভেনিয়ান।