খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
বাংলা সাহিত্যে প্রতিবাদ, মানবতা এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকারের প্রশ্নে যে কজন লেখক আজীবন আপসহীন থেকেছেন, তাঁদের অগ্রভাগে রয়েছেন মহাশ্বেতা দেবী। তিনি শুধু একজন প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক, গল্পকার বা সাংবাদিকই নন; ছিলেন একজন নির্ভীক মানবাধিকারকর্মী, যিনি কলমকে শোষিত-বঞ্চিত মানুষের সংগ্রামের অস্ত্রে পরিণত করেছিলেন।
বিশেষ করে সাঁওতাল, লোধা, শবর, মুন্ডা, খেরিয়া-সহ ভারতের নানা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম, রাষ্ট্রীয় অবহেলা, শোষণ ও বঞ্চনার ইতিহাস তিনি অসামান্য সাহিত্যশক্তিতে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছেন। তাঁর সাহিত্য কেবল কল্পনার জগৎ নয়, বরং বাস্তব জীবনের দলিল।
মহাশ্বেতা দেবীর জন্ম ১৪ জানুয়ারি ১৯২৬ সালে ঢাকার এক সংস্কৃতিমনা শিক্ষিত পরিবারে। তাঁর পিতা মনীশ ঘটক ছিলেন কল্লোল যুগের বিশিষ্ট সাহিত্যিক এবং মাতা ধৃতরী দেবীও ছিলেন লেখিকা ও সমাজসেবী। কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্বিক ঘটক ছিলেন তাঁর কাকা এবং অর্থনীতিবিদ শচীন চৌধুরী ছিলেন তাঁর মামা। সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির আবহেই তাঁর বেড়ে ওঠা।
শিক্ষাজীবনের সূচনা হয় শান্তিনিকেতনের পাঠভবনে। পরে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতক এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৬৪ সালে তিনি কলকাতার বিজয়গড় কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। একই সময়ে সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। তবে শিক্ষকতার গণ্ডি ছাড়িয়ে তিনি মাঠে-ঘাটে ঘুরে আদিবাসী মানুষের জীবন, সংগ্রাম ও বঞ্চনাকে কাছ থেকে দেখেছেন। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর সাহিত্যকে দিয়েছে অনন্য বাস্তবতা ও গভীরতা।
তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘হাজার চুরাশির মা’ নকশাল আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এক মায়ের বেদনা, রাষ্ট্রীয় দমননীতি এবং সময়ের নির্মম বাস্তবতাকে অবিস্মরণীয়ভাবে তুলে ধরেছে। উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক-মানবিক উপন্যাস হিসেবে বিবেচিত হয় এবং পরবর্তীকালে এটি চলচ্চিত্রেও রূপায়িত হয়।
তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে— অরণ্যের অধিকার, রুদালী, চোট্টি মুন্ডা ও তার তীর, অগ্নিগর্ভ, তিতু মীর, স্তনদায়িনী, শিকার পর্ব, ব্যাধখণ্ড, প্রস্থানপর্ব, গণেশ মহিমা, নীল ছবি, মুখ, কৃষ্ণা দ্বাদশী, বেনে বৌ, মিলুর জন্য, ঘোরানো সিঁড়ি প্রভৃতি। তাঁর বহু রচনা ইংরেজিসহ বিশ্বের নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি লাভ করেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, জ্ঞানপীঠ পুরস্কার (১৯৯৬), র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার (১৯৯৭), পদ্মবিভূষণ (২০০৬) এবং সার্ক সাহিত্য পুরস্কার (২০০৭)সহ অসংখ্য দেশি-বিদেশি সম্মাননা। তবে তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল প্রান্তিক মানুষের ভালোবাসা ও আস্থা।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন প্রখ্যাত নাট্যকার ও গণনাট্য আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা বিজন ভট্টাচার্যের সহধর্মিণী। তাঁদের একমাত্র সন্তান নবারুণ ভট্টাচার্য বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল ও স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর।
মহাশ্বেতা দেবী শুধু সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; নন্দীগ্রাম ও সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। আজীবন তিনি নিপীড়িত মানুষের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন।
২০১৬ সালের ২৮ জুলাই কলকাতায় ৯০ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর কলম আজও অন্যায়, বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে বেঁচে আছে।
মহাশ্বেতা দেবী আমাদের শিখিয়েছেন— সাহিত্য কেবল সৌন্দর্যের অন্বেষণ নয়; সাহিত্য হতে পারে ন্যায়বিচার, প্রতিবাদ এবং মানুষের মুক্তির সংগ্রামের শক্তিশালী হাতিয়ার।
আজ তাঁর প্রয়াণদিবসে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র প্রণাম। তাঁর সৃষ্টিকর্ম এবং মানবিক আদর্শ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আলোকবর্তিকার মতো পথ দেখাক।