খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ই আগস্ট ২০২৬, ৪:৩১ পিএম
বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে দেশের মাঠ ও পিচ ব্যবস্থাপনায় দক্ষ স্থানীয় জনবল গড়ে তুলতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। এরই অংশ হিসেবে প্রথমবারের মতো দেশের পিচ কিউরেটর ও মাঠকর্মীদের জন্য লেভেল-১ প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজন করতে যাচ্ছে সংস্থাটি। বাংলাদেশের ক্রিকেট অবকাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদে আরও শক্তিশালী ও পেশাদার করে তুলতে এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আগামী ১১ ও ১২ আগস্ট চট্টগ্রামের ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে দুই দিনের এই প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হবে। বিসিবির হেড অব টার্ফ ম্যানেজমেন্ট টনি হেমিংয়ের নেতৃত্বে কোর্সটি পরিচালিত হবে। প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া কিউরেটর ও মাঠকর্মীদের পিচ ও টার্ফ ব্যবস্থাপনার মৌলিক বিষয়, উইকেট প্রস্তুতির প্রক্রিয়া এবং মাঠের সামগ্রিক পরিচর্যা সম্পর্কে তাত্ত্বিক ও বাস্তবভিত্তিক ধারণা দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
বিসিবির গ্রাউন্ডস কমিটির সদস্যসচিব মাজহার উদ্দিন জানিয়েছেন, দেশের কিউরেটর ও মাঠকর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো লেভেল-১ সনদ কোর্স চালু করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন ভেন্যুতে দায়িত্ব পালন করা কিউরেটর ও মাঠকর্মীদের ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ কিউরেটর তৈরি করার পাশাপাশি মাঠ ব্যবস্থাপনায় পেশাদারিত্ব বাড়ানোর প্রত্যাশা করছে বোর্ড।
প্রথম ধাপের এই প্রশিক্ষণ কর্মশালায় ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রাম থেকে মোট ৩০ জন কিউরেটর অংশ নেবেন। দুই দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষা নেওয়া হবে। পরীক্ষায় সফল অংশগ্রহণকারীরাই লেভেল-১ সনদ অর্জনের যোগ্য হবেন। অর্থাৎ, শুধু কর্মশালায় অংশ নেওয়াই সনদ পাওয়ার জন্য যথেষ্ট হবে না; প্রশিক্ষণে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতার মূল্যায়নের মধ্য দিয়েই যোগ্যতা নির্ধারণ করা হবে।
ক্রিকেটে একটি মাঠের মান অনেকাংশে নির্ভর করে পিচ ও টার্ফ ব্যবস্থাপনার ওপর। একটি ভালো উইকেট তৈরি করতে মাটির ধরন, আর্দ্রতা, ঘাসের বৃদ্ধি, রোলিং, পানি নিষ্কাশন এবং আবহাওয়ার মতো একাধিক বিষয় বিবেচনায় রাখতে হয়। একই সঙ্গে ম্যাচের ধরন ও প্রয়োজন অনুযায়ী পিচের আচরণও পরিকল্পনা করতে হয়। ব্যাটিং ও বোলিংয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে একটি প্রতিযোগিতামূলক উইকেট প্রস্তুত করা তাই কেবল অভিজ্ঞতার বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ।
বাংলাদেশের আবহাওয়া এই কাজকে আরও কঠিন করে তোলে। অতিরিক্ত আর্দ্রতা, মৌসুমি বৃষ্টি এবং তাপমাত্রার পরিবর্তন পিচের প্রস্তুতি ও সংরক্ষণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি দ্রুত সরিয়ে নেওয়া, মাটির আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করা এবং ঘাসের স্বাস্থ্য ধরে রাখা যেমন জরুরি, তেমনি শুষ্ক মৌসুমে উইকেটের কাঠামো ও দৃঢ়তা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে স্থানীয় আবহাওয়া ও মাটির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কিউরেটরের বাস্তব জ্ঞান বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।
দেশের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের পিচ প্রস্তুতির ক্ষেত্রে অতীতে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভরতার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। নতুন এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য সেই নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরি করা। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার পাশাপাশি দেশের নিজস্ব কিউরেটরদের প্রশিক্ষিত করে তোলা হলে দীর্ঘমেয়াদে একটি স্থায়ী দক্ষ জনবল কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হতে পারে।
এই কর্মসূচিকে শুধু একটি সনদ প্রদান কার্যক্রম হিসেবে দেখছে না বিসিবি। বরং এর মাধ্যমে দেশের ক্রিকেট ভেন্যুগুলোতে পিচ ও মাঠ ব্যবস্থাপনার একটি অভিন্ন পেশাদার মানদণ্ড তৈরির ভিত্তি গড়ে উঠতে পারে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন এবং মাঠপর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতার সুযোগ পেলে স্থানীয় কিউরেটরদের দক্ষতা আরও পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে ঘরোয়া ক্রিকেটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের ক্ষেত্রেও ভেন্যুগুলোর প্রস্তুতি আরও ধারাবাহিক হতে পারে।
চট্টগ্রামে অনুষ্ঠেয় দুই দিনের এই কর্মশালার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে কিউরেটর প্রশিক্ষণের আনুষ্ঠানিক যাত্রার একটি নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। প্রথম ধাপে ৩০ জন কিউরেটরকে নিয়ে শুরু হলেও ভবিষ্যতে কার্যক্রমটি আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে। প্রশিক্ষিত কিউরেটরদের একটি শক্তিশালী ও পেশাদার নেটওয়ার্ক গড়ে উঠলে দেশের বিভিন্ন ভেন্যুতে পিচের মান নিয়ন্ত্রণ, মাঠের রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থানীয় পরিবেশ অনুযায়ী উইকেট প্রস্তুতের সক্ষমতা বাড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এই উদ্যোগ বাংলাদেশের ক্রিকেট অবকাঠামোকে আরও স্বনির্ভর করে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
মন্তব্য