খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ই আগস্ট ২০২৬, ৪:৩৫ পিএম
দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনো প্রত্যাশিত মানে পৌঁছাতে পারেনি বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তাঁর মতে, ব্যাংকিং খাতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিদ্যমান দুর্বলতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য বড় ধরনের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর্থিক খাতের অবকাঠামো যত বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে, সাইবার হামলার ঝুঁকিও তত বাড়ছে—এমন বাস্তবতায় ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা কাঠামো আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। তিনি বলেন, দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। ব্যাংকিং ব্যবস্থার এই দুর্বলতা শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নয়, পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্যই ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিয়মিতভাবে উদ্বিগ্ন থাকতে হচ্ছে।
বর্তমান সময়ে ব্যাংকিং সেবা ক্রমেই অনলাইন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মনির্ভর হয়ে উঠছে। ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপ, কার্ডভিত্তিক লেনদেন এবং বিভিন্ন ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তারের ফলে গ্রাহকদের জন্য ব্যাংকিং অনেক সহজ হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর তথ্যভান্ডারে জমা হচ্ছে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ও ব্যক্তিগত তথ্য। এসব তথ্য সুরক্ষিত রাখা এবং অননুমোদিত প্রবেশ ঠেকানো এখন ব্যাংকিং খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কোনো প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দুর্বলতা থাকলে তা গ্রাহকের তথ্য, লেনদেন এবং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কার্যক্রমকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদও ভবিষ্যৎ সাইবার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, আগামী দিনে সাইবার হামলার ঘটনা কমার সম্ভাবনা নেই; বরং এসব হামলা আরও বাড়তে পারে। প্রযুক্তির ব্যবহার যত বিস্তৃত হচ্ছে, সাইবার অপরাধীদের আক্রমণের ক্ষেত্রও তত বড় হচ্ছে। তাই শুধু কোনো একটি প্রতিষ্ঠান বা সরকারি সংস্থার উদ্যোগে এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। সমন্বিত উদ্যোগ এবং কার্যকর প্রস্তুতির মাধ্যমে সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনো অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে কাজ করে দেশের সামগ্রিক সাইবার নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। তথ্য সুরক্ষা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, নিরাপত্তা ব্যবস্থার নিয়মিত পরীক্ষা এবং সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় প্রস্তুতি—সব ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
অনুষ্ঠানে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপব্যবহারের বিষয়টিও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাকস্বাধীনতার নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বুলিং, মিথ্যা তথ্য এবং হয়রানিমূলক কনটেন্টের প্রচারণা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই চলতে দেওয়া হবে না বলে তিনি জানান।
এ ছাড়া সরকারকে ঘিরে মিথ্যা প্রচারণা ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের বিস্তার ঠেকাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে মেটা, গুগলসহ সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মগুলোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে শিগগির বৈঠক করা হবে বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাইবার নিরাপত্তা এখন আর কেবল প্রযুক্তি বিভাগের বিষয় নয়; এটি আর্থিক স্থিতিশীলতা, গ্রাহকের আস্থা এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। ব্যাংকিং খাতে নিরাপত্তা জোরদারে আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি দক্ষ জনবল, নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন, কর্মীদের সচেতনতা এবং দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য বিনিময় ও সমন্বিত প্রস্তুতি থাকলে সম্ভাব্য সাইবার হামলার ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও দৈনন্দিন লেনদেনে ব্যাংকিং খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় সাইবার নিরাপত্তার এই উদ্বেগকে তাই কেবল প্রযুক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং সম্ভাব্য হামলার বিরুদ্ধে আগাম প্রস্তুতি নেওয়াই এখন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
মন্তব্য