খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ই আগস্ট ২০২৬, ৩:৩৭ পিএম
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত একটি প্রামাণ্যচিত্রকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রামাণ্যচিত্রে জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন ঘটনার উপস্থাপন নিয়ে আপত্তি জানিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মী, জুলাই আন্দোলনে আহত কয়েকজন এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের একাংশ বিক্ষোভ ও হট্টগোলে অংশ নেন। পরে সরকারের পক্ষ থেকে আপত্তির বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের আশ্বাস দেওয়া হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
বুধবার দুপুর ১২টায় রাজধানীর শেরেবাংলানগরের চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম। অনুষ্ঠানে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, জুলাই আন্দোলনে আহত ব্যক্তিরা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন ধাপ, ঘটনাপ্রবাহ এবং আন্দোলনের প্রেক্ষাপট নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। প্রদর্শনী শেষ হওয়ার পরপরই উপস্থিত কয়েকজন আহত আন্দোলনকারী, শহীদ পরিবারের সদস্য এবং এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীরা প্রামাণ্যচিত্রের বিষয়বস্তু নিয়ে আপত্তি তোলেন। তাদের অভিযোগ, আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনা এবং কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ভূমিকা যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। এ সময় হলরুমে ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান দিতে থাকেন বিক্ষোভকারীরা, যার ফলে অনুষ্ঠানস্থলে সাময়িক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আহমেদ আযম খান মাইকে উপস্থিত সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানকে ঘিরে শৃঙ্খলা বজায় রাখা সবার দায়িত্ব। তবে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, যখন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন উপস্থিতদের উদ্দেশে বলেন, “আপনারা এখানে নিজেকে জাহির করতে আসছেন।” তার এই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান বিক্ষোভকারীরা এবং হলরুমে উত্তেজনা আরও বাড়ে।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ মাইকে বক্তব্য দিয়ে সবাইকে সংযত থাকার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, যাদের প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে আপত্তি রয়েছে, তারা যেন মঞ্চে এসে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।
এরপর এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন মঞ্চে উঠে প্রামাণ্যচিত্রের বিভিন্ন দিক নিয়ে আপত্তি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিশেষ করে ৩ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ এবং আন্দোলনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব অসংগতি সংশোধনের জন্য বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে জানানো হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হবে। একই সঙ্গে তিনি শহীদ পরিবারের সদস্যদের প্রতি সম্মান জানিয়ে সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান।
পরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেন, প্রদর্শিত প্রামাণ্যচিত্রে যদি প্রকৃতপক্ষে কোনো তথ্যগত অসংগতি বা ত্রুটি থেকে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়ে তা পর্যালোচনা করা হবে। প্রয়োজন হলে সংশোধনও করা হবে। তিনি বলেন, প্রামাণ্যচিত্রের কোনো অংশে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে সে জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করছেন।
ঘটনার বিষয়ে এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব মাহিন সরকারও বক্তব্য দেন। তিনি দাবি করেন, প্রামাণ্যচিত্রে ‘এক দফা’ ঘোষণার বিষয়টি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তার অভিযোগ, সেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ‘এক দফা’র ঘোষক হিসেবে দেখানো হলেও তাদের দাবি অনুযায়ী এই ঘোষণা দিয়েছিলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি এটিকে ইতিহাস বিকৃতির প্রচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেন এবং এর প্রতিবাদে অনুষ্ঠান বয়কটের ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, অনুষ্ঠানস্থলে বিএনপির নেতাকর্মীরা তার ওপর হামলা চালিয়েছেন।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টেও মাহিন সরকার একই অভিযোগ পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি লেখেন, রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে প্রামাণ্যচিত্রের প্রতিবাদ করায় তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, প্রামাণ্যচিত্রে নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদের ভূমিকা যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি, যা আন্দোলনের ইতিহাসের সঠিক উপস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে তিনি মনে করেন।
এই ঘটনার পর রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্মিত ঐতিহাসিক প্রামাণ্যচিত্রে তথ্য উপস্থাপনের নির্ভুলতা, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত গ্রহণ এবং ইতিহাস সংরক্ষণে দায়িত্বশীলতার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রামাণ্যচিত্রটি পর্যালোচনা করে অভিযোগগুলো যাচাইয়ের আশ্বাস দেওয়া হলেও এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে এখন সংশ্লিষ্ট মহলের নজর রয়েছে।
মন্তব্য