নোবেলজয়ী কবি, সাহিত্যিক ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮৫তম প্রয়াণবার্ষিকী আজ বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) বাংলাদেশে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে। বাংলা সাহিত্য, সংগীত, শিল্প ও সংস্কৃতিতে অনন্য অবদান রাখা এই মহান স্রষ্টাকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছেন অসংখ্য মানুষ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী, তাঁর প্রয়াণ দিবস বাংলাদেশে প্রতিবছর ২২ শ্রাবণ পালন করা হয়। এ বছর ২২ শ্রাবণ পড়েছে ৬ আগস্ট, তাই দিনটি ঘিরে দেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
১৮৬১ সালের ৭ মে (বাংলা ২৫ বৈশাখ ১২৬৮) কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঐতিহ্যবাহী ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সারদা দেবীর ১৩ জন জীবিত সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য, সংগীত ও শিল্পচর্চার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। পারিবারিক পরিবেশ, দেশীয় সংস্কৃতির চর্চা এবং বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় তাঁর সৃজনশীল প্রতিভাকে বিকশিত করে।
প্রায় সাত দশকের দীর্ঘ সৃষ্টিশীল জীবনে রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন অসংখ্য কবিতা, গান, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ ও চিত্রকর্মের মাধ্যমে। তাঁর রচনায় মানবতাবাদ, প্রকৃতিপ্রেম, স্বাধীন চিন্তা, সমাজ সচেতনতা এবং মানুষের অন্তর্গত অনুভূতির গভীর প্রকাশ পাওয়া যায়।
রবীন্দ্রনাথের সৃষ্ট গানের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। এসব গান নিয়ে গড়ে উঠেছে স্বতন্ত্র সংগীতধারা ‘রবীন্দ্রসংগীত’, যা আজও বাঙালির আবেগ, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে গীতাঞ্জলি, গোরা, ঘরে-বাইরে, শেষের কবিতা, চোখের বালি, ডাকঘরসহ বহু কালজয়ী সৃষ্টি।
বিশ্বসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয় ১৯১৩ সালে। তাঁর কাব্যগ্রন্থ গীতাঞ্জলি-র জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এর মাধ্যমে তিনি শুধু ভারতীয় উপমহাদেশ নয়, সমগ্র এশিয়ার প্রথম নোবেলজয়ী সাহিত্যিক হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন। তাঁর সাহিত্যকর্ম বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির পরিচিতি বাড়িয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির আরেকটি অনন্য দিক হলো জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক। তাঁর লেখা দুটি গান দুটি দেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত “আমার সোনার বাংলা” এবং ভারতের জাতীয় সংগীত “জন গণ মন”—দুটি সৃষ্টিই রবীন্দ্রনাথের অসাধারণ প্রতিভার সাক্ষ্য বহন করে।
রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে প্রচার করা হচ্ছে বিশেষ অনুষ্ঠান, যেখানে থাকছে রবীন্দ্রসংগীত, কবিতা আবৃত্তি, আলোচনা অনুষ্ঠান, প্রামাণ্যচিত্র ও তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী আয়োজন।
সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা মনে করেন, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও দর্শন আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। মানুষের মুক্তি, সাম্য, ভালোবাসা ও সৌন্দর্যের যে বার্তা তিনি রেখে গেছেন, তা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।
৮৫ বছর পরও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালির চিন্তা, চেতনা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছেন। তাঁর সৃষ্টি শুধু একটি সময়ের প্রতিনিধিত্ব করে না; বরং তা মানুষের চিরন্তন অনুভূতি ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতিচ্ছবি হিসেবে টিকে রয়েছে।
মন্তব্য