খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই আগস্ট ২০২৬, ৬:৪২ পিএম
বাংলা গানের ইতিহাসে কিছু নাম সময়ের স্রোতে ম্লান হয়ে যায়, অথচ তাঁদের সৃষ্টি থেকে যায় মানুষের হৃদয়ে। তাঁদের লেখা গান মানুষ গায়, শুনে আবেগাপ্লুত হয়, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেয়—কিন্তু গানের স্রষ্টার নামটি অনেক সময়ই বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যায়।
শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তেমনই এক বিস্মৃত অথচ অনন্য প্রতিভাধর বাঙালি কবি ও কালজয়ী গীতিকার।
বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলা ছায়াছবি ও আধুনিক গানের ভুবনে যাঁরা অসাধারণ কথামালা দিয়ে বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করেছিলেন, শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের অন্যতম। তাঁর লেখা গান কখনো মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে, কখনো প্রতিবাদের ভাষা দিয়েছে, কখনো মানবতার কথা বলেছে, আবার কখনো নদী-মাটি-মানুষের গভীর আত্মিক সম্পর্ককে তুলে ধরেছে।
জন্ম— ২৭ ডিসেম্বর ১৯৩২, খুলনা শহর।
পিতা শচীগোপাল বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। মা রাধারাণী দেবী ছিলেন স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এক সাহসী নারী।
খুলনাতেই স্থানীয় বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা। কিন্তু ১৯৪৭-এর দেশভাগ তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিভীষিকায় ঘরবাড়ি, সহায়-সম্বল ছেড়ে পরিবারের সঙ্গে তাঁকে শরণার্থী হয়ে পাড়ি জমাতে হয় কলকাতায়।
দক্ষিণ কলকাতায় আশ্রয় মেলে তাঁর দিদি, প্রাবন্ধিক ও চিত্রগ্রাহক শিবানী চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে। প্রতিকূলতার মধ্যেও থেমে থাকেননি তিনি। আশুতোষ কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে খানপুর স্কুলে সামান্য বেতনের শিক্ষকতার চাকরিতে যোগ দেন।
কিন্তু তাঁর হৃদয়ের গভীরে তখন শব্দেরা ক্রমশ গান হয়ে উঠছে।
দিদি শিবানী চট্টোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণায় শুরু হয় তাঁর সাহিত্যচর্চা। আনন্দবাজার পত্রিকার রবিবাসরীয়, দেশ, বসুমতীসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে তাঁর লেখা। চল্লিশ থেকে ষাটের দশকের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের অভিঘাতও তাঁর চিন্তা ও সৃষ্টিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
প্রখ্যাত সুরকার ও সংগীতশিল্পী অপরেশ লাহিড়ীর অনুপ্রেরণায় ‘ক্রান্তি শিল্পী সংঘ’-এর জন্য গান লেখা শুরু করেন। সেখান থেকেই গীতিকার হিসেবে তাঁর পরিচিতির বিস্তার।
এরপর এক সাহিত্যসভায় কবি ও চলচ্চিত্রকার প্রেমেন্দ্র মিত্রের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। প্রেমেন্দ্র মিত্রের সহযোগিতায় তিনি আকাশবাণীর তালিকাভুক্ত গীতিকার হওয়ার সুযোগ পান। আর তারপরই বাংলা গানের ভুবনে শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ ও উজ্জ্বল পথচলা।
তাঁর লেখা গান কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন উপমহাদেশের অসংখ্য কিংবদন্তি শিল্পী—ইলা বসু, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, রুনা লায়লা, রুমা গুহঠাকুরতা, মান্না দে, কিশোর কুমার, অংশুমান রায়, ভূপেন হাজারিকা, লতা মঙ্গেশকরসহ আরও বহু স্বনামধন্য শিল্পী।
তাঁর কলম থেকে বেরিয়ে এসেছে এমন সব গান, যেগুলো আজও বাংলা গানের ভাণ্ডারে অমূল্য সম্পদ—
‘আমি এক যাযাবর’,
‘মানুষ মানুষের জন্য’,
‘দোলা হে দোলা’,
‘বিস্তীর্ণ দু’পারে’,
‘সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনায় নজরুল’—
প্রতিটি গান যেন একেকটি সময়ের দলিল, একেকটি অনুভূতির ভাষা।
বিশেষ করে ‘মানুষ মানুষের জন্য’ গানটি মানবতার এক অনন্য সংগীত-দলিল হয়ে আজও মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলনের প্রতি গভীর সহমর্মিতা থেকে শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন ‘গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা’। গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন ভূপেন হাজারিকা। গঙ্গা ও পদ্মাকে একই মমতার স্রোতে মিলিয়ে দেওয়া সেই গান দুই বাংলার মানুষের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নেয়।
তবে এই সাফল্যের আড়ালেও ছিল এক নির্মম বঞ্চনার ইতিহাস।
গীতিকার হিসেবে শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রাপ্য সম্মান ও স্বীকৃতি পাননি—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তাঁর সৃষ্টির জনপ্রিয়তা আকাশ ছুঁলেও স্রষ্টার নাম অনেক সময়ই রয়ে গেছে আড়ালে। এমনকি ‘গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা’ গানটির পরবর্তী অসমীয়া রূপান্তরের ক্ষেত্রে মূল রচয়িতা হিসেবে শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি—এমন কথাও তাঁর জীবনকথায় উঠে আসে।
এ এক বড় বেদনার কথা—
যে মানুষটি মানুষের মুখে গান তুলে দিলেন, তাঁর নিজের জীবনে স্বীকৃতির আলো পৌঁছাল না যথেষ্ট।
কালজয়ী অসংখ্য গানের এই স্রষ্টার জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল আরও বেদনাবিধুর। জীবনের শেষদিকে চরম অর্থকষ্ট ও দারিদ্র্যের সঙ্গে তাঁকে লড়াই করতে হয়েছে। যে মানুষটির কলম বাংলা গানের ভুবনকে সমৃদ্ধ করেছিল, তাঁর জীবনই শেষ পর্যন্ত অভাব-অনটনের নির্মমতায় ক্ষতবিক্ষত হয়েছে।
৮ আগস্ট ২০০৯—নিঃশব্দে থেমে যায় এই অসামান্য গীতিকারের জীবনপ্রদীপ।
তবে শিল্পীর মৃত্যু হয়, সৃষ্টির নয়।
আজও যখন কোথাও ভেসে আসে—
‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য…’
তখন শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলম যেন আবারও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের চেয়ে বড় কোনো পরিচয় নেই, মানবতার চেয়ে বড় কোনো ধর্ম নেই।
বিস্মৃতির অন্ধকার যতই ঘন হোক, তাঁর গান বেঁচে থাকবে মানুষের কণ্ঠে, স্মৃতিতে ও ভালোবাসায়।
কালজয়ী এই গীতিকারের স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে কলকাতা পুরসভার উদ্যোগে ১১২ নম্বর ওয়ার্ডে তাঁর একটি আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। তাঁর ভাগ্নে ও পশ্চিমবঙ্গের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় সেটি উদ্বোধন করেন—এটুকু স্বীকৃতি হয়তো তাঁর দীর্ঘ বঞ্চনার সম্পূর্ণ প্রতিকার নয়, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধার এক উজ্জ্বল স্মারক হয়ে থাকবে।
শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়—
নামটি হয়তো অনেকের স্মৃতিতে আজ ম্লান,
কিন্তু তাঁর গান আজও অম্লান।
গানের কথায় তিনি বুনেছিলেন মানুষ, মাটি, নদী, প্রেম, প্রতিবাদ আর মানবতার গল্প। তাই তাঁকে বিস্মৃত করা যায়, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না।
বিস্মৃত গীতিকারের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।
মন্তব্য