খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই আগস্ট ২০২৬, ১০:১৬ পিএম
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে দেখা দেওয়া চরম অস্থিতিশীলতার মুখে গঠিত হলো বহুল আলোচিত যৌথ প্রতিরক্ষা জোট। ঐতিহাসিক এই পদক্ষেপের অংশ হিসেবে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক একটি ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করেছে। ‘মক্কা যৌথ প্রতিরোধ চুক্তি’ নামে পরিচিত এই ঐতিহাসিক সামরিক সমঝোতাটি সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় স্বাক্ষরিত হয়। নিজ নিজ দেশের পক্ষে যৌথ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদির যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ।
চুক্তির সবচেয়ে বড় দিক হলো এর যৌথ নিরাপত্তা বিধান। স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এই তিন মিত্র দেশের যেকোনো একটির সার্বভৌমত্ব বা ভূখণ্ডের ওপর বহিরাগত সশস্ত্র হামলা হলে তা বাকি দুটি দেশের ওপর যৌথ আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হবে। সে ক্ষেত্রে সকল পক্ষ একযোগে সেই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সামরিক প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পৃথক বিবৃতিতে জানায়, মুসলিম বিশ্বের এই তিন প্রধান শক্তির চুক্তিটি তাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সম্পর্ক, ভ্রাতৃত্বের স্থায়ী বন্ধন ও ইসলামিক সংহতির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। মধ্যপ্রাচ্য ও এর আশপাশের অঞ্চলে কৌশলগত নিরাপত্তা, সামরিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই শান্তি বজায় রাখতে এই পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। উল্লেখ্য, সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে সাথে নিয়ে পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী মক্কায় ওমরাহ পালনের পরপরই এই ত্রিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক ও চুক্তি স্বাক্ষরের ঘটনা ঘটে।
মক্কা যৌথ প্রতিরোধ চুক্তির মূল উপাদান
যৌথ প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার: অংশগ্রহণকারী কোনো এক দেশের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ মানে পুরো জোটের ওপর আক্রমণ হিসেবে ধরা হবে।
কৌশলগত শক্তির একত্রীকরণ: তুর্কি সামরিক প্রযুক্তি, সৌদির অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতার সমন্বয়।
গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান: অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলায় তিন দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তাৎক্ষণিক তথ্য শেয়ারিং।
প্রতিরক্ষা শিল্পে যৌথ বিনিয়োগ: অস্ত্রের জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে যৌথভাবে প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা বলয়: হরমুজ প্রণালিসহ আশেপাশের সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও অনাকাঙ্ক্ষিত সঙ্ঘাত রোধ।
বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তির পটভূমি রাতারাতি তৈরি হয়নি। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় শুরু হওয়া ইসরায়েলি গণহত্যা, পরবর্তীতে লেবানন ও সিরিয়ায় হামলা এবং সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক আগ্রাসনের ফলে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটি এবং সৌদি আরবের অবকাঠামো হুমকির মুখে পড়ে। বিশেষ করে ইয়েমেনের হুতি ও ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ড্রোন হামলা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে। ফলে ওয়াশিংটন বা পশ্চিমাদের ওপর একমুখী নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের মধ্যে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন তৈরির প্রয়োজন তৈরি হয়। সেই উপলব্ধির অংশ হিসেবেই মূলত ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক ক্ষমতার দেশ তুরস্ক, শীর্ষ তেল অর্থনীতির দেশ সৌদি আরব এবং একমাত্র মুসলিম পারমাণবিক শক্তিধর দেশ পাকিস্তান এক ছাতার নিচে অবস্থান নিল।
চুক্তিটি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ইরানি নেতৃত্বের পক্ষ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক মন্তব্য না আসলেও দেশটির সংসদ সদস্য ইব্রাহিম রেজাই সমালোচনা করে বলেন, অন্য দেশের কাছে নিরাপত্তার ভিক্ষা না চেয়ে সৌদির উচিত নিজেদের নীতি সংশোধন করা। অন্যদিকে ইসরায়েল আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকলেও এই চুক্তিকে ঘিরে তাদের মধ্যে উদ্বেগ স্পষ্ট। বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক নীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তি নির্দিষ্ট করে কারো বিরুদ্ধে নয়, বরং ক্ষয়িষ্ণু বিশ্বব্যবস্থায় মুসলিম অঞ্চলের নিজস্ব ভূখণ্ড ও ভূ-রাজনীতি রক্ষার একটি শক্তিশালী ঢাল।
মন্তব্য