খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ই আগস্ট ২০২৬, ১২:১৮ পিএম
বাংলাদেশের চিত্রকলার আকাশে কিছু শিল্পী আছেন, যাঁরা শুধু ছবি আঁকেননি—তুলির আঁচড়ে এঁকেছেন মানুষের জীবন, মাটির গন্ধ, কৃষকের ঘাম, শ্রমজীবী মানুষের শক্তি আর বাংলার স্বপ্ন।
এস এম সুলতান তাঁদেরই একজন।
তাঁর ক্যানভাসে গ্রামবাংলার কৃষক কখনো নিতান্ত দুর্বল, অসহায় মানুষ নয়; বরং বিশাল পেশিবহুল দেহে তাঁরা যেন মাটির সন্তান, শ্রমের প্রতীক, সংগ্রামের নায়ক। কৃষক, জেলে, শ্রমজীবী মানুষ—তাঁদের মধ্যেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রকৃত শক্তি ও সৌন্দর্য।
পুরো নাম শেখ মোহাম্মদ সুলতান।
শৈশবের ডাকনাম ছিল ‘লাল মিয়া’।
১৯২৩ সালের ১০ আগস্ট নড়াইলের মাছিমদিয়া গ্রামের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে তাঁর জন্ম। ছোটবেলা থেকেই আঁকার প্রতি ছিল প্রবল আকর্ষণ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ খুব বেশি না থাকলেও তাঁর অসাধারণ প্রতিভা ও শিল্পের প্রতি গভীর আকর্ষণ তাঁকে ধীরে ধীরে নিয়ে যায় বৃহত্তর শিল্পজগতের দিকে।
১৯২৮ সালে তিনি নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার কাজে সহযোগিতা করতে হতো। কিন্তু দারিদ্র্য তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে থামাতে পারেনি। বরং মাটি, মানুষ আর শ্রমের কাছাকাছি থাকা তাঁর শিল্পবোধকে আরও গভীর করে তুলেছিল।
কৈশোরেই তাঁর প্রতিভার পরিচয় মেলে। মানুষের মুখাবয়ব আঁকার মধ্য দিয়ে তাঁর শিল্পীসত্তার বিকাশ শুরু হয়। পরে কলকাতায় গিয়ে শিল্পের বৃহত্তর পরিসরের সঙ্গে পরিচিত হন এবং চিত্রসমালোচক শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্য তাঁর শিল্পজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
চল্লিশের দশকে কলকাতা আর্ট স্কুলে তাঁর শিল্পশিক্ষার সুযোগ তৈরি হয়। তবে প্রচলিত একাডেমিক ধারার গণ্ডিতে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি তিনি। শিল্পের নিজস্ব পথ খুঁজেছেন নিজের মতো করে।
দেশ-বিদেশে তাঁর ছবির প্রদর্শনী হয়েছে। ১৯৪৬ সালে সিমলায় তাঁর ছবির প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, শিকাগো, বোস্টন ও লন্ডনসহ বিভিন্ন স্থানে তাঁর শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়।
তবে বিদেশের ঝলমলে শিল্পজগত তাঁকে তাঁর শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি।
১৯৫৩ সালে নড়াইলে ফিরে এসে তিনি যেন আবার ফিরে পেলেন তাঁর প্রকৃত পৃথিবী—মাটি, মানুষ আর শৈশবের বাংলাদেশ।
শুধু ছবি আঁকা নয়, শিশুদের শিক্ষার প্রতিও তাঁর ছিল গভীর দায়বদ্ধতা। শিশুদের নিয়ে তাঁর স্বপ্ন ছিল বিস্তৃত। নড়াইলে তিনি শিশুদের সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি শিল্পশিক্ষার সুযোগ তৈরি করেন। ‘নন্দন কানন’সহ বিভিন্ন শিক্ষা উদ্যোগ এবং পরবর্তীকালে ‘শিশুস্বর্গ’ ও ‘চারুপীঠ’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি শিশুদের জন্য একটি মুক্ত, সৃজনশীল পৃথিবী গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।
তাঁর কাছে শিল্প ছিল নিছক সৌন্দর্যের অনুশীলন নয়।
শিল্প ছিল মানুষের কথা বলার ভাষা।
তাই তাঁর ছবির কৃষকরা এত শক্তিশালী। তাঁদের শরীরের পেশিতে শুধু শারীরিক শক্তি নয়—লুকিয়ে থাকে যুগ যুগ ধরে শোষণ, সংগ্রাম ও বেঁচে থাকার অদম্য আকাঙ্ক্ষা।
এস এম সুলতানের শিল্পে বাংলার কৃষক যেন মাটির বুক থেকে উঠে আসা একেকজন মহাকাব্যের চরিত্র।
তিনি শুধু মানুষ আঁকেননি—
মানুষের ভেতরের শক্তিকে এঁকেছেন।
শুধু ক্ষেত আঁকেননি—
এঁকেছেন খাদ্য উৎপাদনের মহাকাব্য।
শুধু গ্রাম আঁকেননি—
এঁকেছেন বাংলাদেশের আত্মাকে।
চিত্রকলার বাইরে তাঁর জীবনযাপনও ছিল একেবারেই স্বতন্ত্র। বাঁশি ও বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন। পশুপাখির প্রতিও ছিল তাঁর অসাধারণ মমতা। তাঁর চারপাশে ছিল নানা প্রাণী ও পাখির বিচরণ। প্রকৃতি, প্রাণী ও মানুষের প্রতি এই গভীর ভালোবাসা তাঁর জীবনদর্শনেরই অংশ ছিল।
হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি তাঁর পছন্দ ছিল না। তাঁর শিল্পের গভীরে তাই মানুষের প্রতি মমতা, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং একটি শান্তিপূর্ণ পৃথিবীর স্বপ্ন বারবার ফিরে এসেছে।
শিল্পী হিসেবে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিও এসেছে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে।
১৯৮২ সালে তিনি লাভ করেন একুশে পদক।
১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা এবং
১৯৯৩ সালে লাভ করেন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘স্বাধীনতা পদক’।
তাঁর শিল্পকর্ম ও জীবনদর্শন তাঁকে বাংলাদেশের চিত্রকলায় একটি অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর আঁকা পেশিবহুল কৃষক-জেলে-শ্রমজীবী মানুষ আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এই দেশকে যারা ঘাম, শ্রম আর মেধা দিয়ে গড়ে তোলে, তারাই এই মাটির প্রকৃত নায়ক।
এস এম সুলতানের ক্যানভাসে তাই শুধু রং নেই—
আছে বাংলার মাটি।
আছে মানুষের ঘাম।
আছে শ্রমের সৌন্দর্য।
আছে স্বপ্ন ও সংগ্রাম।
আর আছে একটি মানবিক পৃথিবীর আকাঙ্ক্ষা।
১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে এই কিংবদন্তি শিল্পীর জীবনাবসান ঘটে। নড়াইলের মাটিতেই তাঁর শেষ ঠিকানা।
কিন্তু শিল্পীর মৃত্যু হয় না।
শিল্পী বেঁচে থাকেন তাঁর সৃষ্টিতে।
বেঁচে থাকেন তাঁর রঙে।
বেঁচে থাকেন তাঁর আঁকা মানুষের চোখে।
বেঁচে থাকেন তাঁর স্বপ্নে।
এস এম সুলতানও তাই আজ আর কেবল একজন প্রয়াত চিত্রশিল্পীর নাম নন—
তিনি বাংলার মাটি ও মানুষের শিল্পী।
তাঁর তুলির প্রতিটি আঁচড় যেন বলে যায়-
এই মাটি আমাদের,
এই মানুষ আমাদের,
এই শ্রমই আমাদের শক্তি,
আর মানুষের মধ্যেই লুকিয়ে আছে
একটি সুন্দর পৃথিবীর সম্ভাবনা।
আজ তাঁর জন্মদিনে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি
বাংলাদেশের চিত্রকলার এই কালজয়ী শিল্পীকে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।
শিল্পী এস এম সুলতান—
আপনি আপনার রঙে, রেখায় ও মানুষের স্বপ্নে
চিরকাল বেঁচে থাকবেন।
মন্তব্য