খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই আগস্ট ২০২৬, ১:৫৭ পিএম
বাংলাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক যৌন নির্যাতনের ঘটনাগুলো সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক ও আইনি অঙ্গনে ব্যাপক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে আবাসিক মাদ্রাসাগুলোতে শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়ন ও বলাৎকারের ঘটনা একের পর এক সামনে আসায় মানবাধিকার সংস্থা, গবেষক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও দেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলো পত্রিকা ও সংবাদমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে সামগ্রিক ধর্ষণের পরিসংখ্যান প্রকাশ করে, তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা মাদ্রাসাভিত্তিক কোনো পৃথক ও ধারাবাহিক সরকারি পরিসংখ্যান সংরক্ষিত হয় না। ফলে প্রকৃত চিত্র সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
মাদ্রাসাগুলোতে শিশুশিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়নের ভয়াবহতা উঠে এসেছে বিভিন্ন সময় পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষকদের ঘটনায়:
কুষ্টিয়ার কুমারখালী (জুলাই): মোস্তাফিজুর রহমান নামের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীকে বলাৎকার ও পরে ঘটনা গোপন রাখতে ‘স্বপ্ন দেখার’ অজুহাত দিয়ে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের আপস-সালিশের চেষ্টা ব্যর্থ করে ভুক্তভোগীর বাবা আইনের আশ্রয় নিলে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
চট্টগ্রামের বাঁশখালী (আগস্ট): ৮ বছর বয়সী এক শিশুশিক্ষার্থীকে দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশরুমে নিয়ে বলাৎকারের অভিযোগে মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ রমিজ উদ্দীনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
নেত্রকোনা (মে): আমানুল্লা মাহমুদী নামের এক শিক্ষকের একাধিকবারের ধর্ষণের শিকার হয়ে ১১ বছরের এক শিশুশিক্ষার্থী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। অভিযোগ দায়েরের পর পুলিশ ওই শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে।
গাজীপুরের শ্রীপুর: শিশুশিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে স্থানীয়দের হাতে আটক হন শিক্ষক আবদুল মালেক। পরে তিনি নিজের অপরাধ স্বীকার করলে তাকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়।
নারায়ণগঞ্জ ও নেত্রকোনা (পূর্ববর্তী ঘটনা): নারায়ণগঞ্জে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে আখিরাতের ভয় ও তাবিজের হুমকিতে ৩ বছরে ১১ জন শিক্ষার্থীকে যৌন নির্যাতনের তথ্য প্রকাশ করে র্যাব। অন্যদিকে নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় পবিত্র কোরআন স্পর্শ করিয়ে শপথের মাধ্যমে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টাকালে এক অধ্যক্ষ গণপিটুনির শিকার হন।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের মাত্রা আশঙ্কাজনক। নিচে চলতি সময়কালের প্রকাশিত ধর্ষণের তথ্যাবলীর একটি সারণি তুলে ধরা হলো:
| সংস্থা/প্রতিবেদন | সময়কাল | মোট ধর্ষণের ঘটনা | শিশু ও কিশোরী ভুক্তভোগী | ধর্ষণের পর হত্যা |
| হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (HRSS) | জানুয়ারি – জুন | ৪০৪টি | ২৩৮ জন | ১৭ জন |
| হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (HRSS) | জুলাই (একক মাস) | ৯৫টি | ৬১ জন (১৮ বছরের কম) | – (গণধর্ষণ: ১১ জন) |
| আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) | জানুয়ারি – জুন | ৩১৯টি | ১৬৪ জন (অপ্রাপ্তবয়স্ক) | ৩০ জন |
| আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) | বিগত পূর্ণাঙ্গ বছর | ৭৫৯টি | ৩৭০ জন (অপ্রাপ্তবয়স্ক) | ৩৬ জন |
মানবাধিকার সংগঠন ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ (আসক)-এর পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক যৌন হয়রানি ও বলাৎকারের বড় একটি অংশ ঘটছে আবাসিক মাদ্রাসাগুলোতে। সেখানে মেয়েদের পাশাপাশি ছেলেরাও সমহারে বলাৎকারের শিকার হচ্ছে। সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের অভিভাবকরা নিয়মিত খোঁজখবর না নেওয়া, প্রাতিষ্ঠানিক মনিটরিংয়ের অভাব এবং ধর্মের দোহাই দিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন—এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে দীর্ঘায়িত করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষাবিদরা মনে করেন, চরম নজরদারির অভাব এবং জবাবদিহিতার ঘাটতিই এই পরিবেশ তৈরি করছে। উচ্চ আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল গড়ে ওঠেনি। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এটিকে একক কোনো প্রতিষ্ঠানের সমস্যা না দেখে সামগ্রিক শিশুকাম প্রবৃত্তি ও সামাজিক সুরক্ষার দুর্বলতা হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক) ও আলিয়া মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের একাংশ বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখার দাবি করেছেন। বেফাকের দায়িত্বশীলদের মতে, নিবন্ধিত প্রায় ৩৫ হাজার কওমি মাদ্রাসায় যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নির্দিষ্ট নীতিমালা, সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও নিজস্ব মনিটরিং ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তবে অনিবন্ধিত আনুমানিক ১৫ হাজার মাদ্রাসায় সরকারের বা বোর্ডের নজরদারি পৌঁছায় না।
অন্যদিকে, কিছু মাদ্রাসা পরিচালকের দাবি—এসব ঘটনার বড় অংশই কওমি মাদ্রাসা ও দ্বীনি শিক্ষার বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং ইউটিউব বা সংবাদমাধ্যমের অতি-উৎসাহী প্রচারের ফল। তবে তারা স্বীকার করেন যে, অপরাধ সংঘটিত হলে আইনগত ব্যবস্থা ও জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা উচিত।
বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, ছেলে বা মেয়ে যেকোনো শিশুর ওপর যৌন অত্যাচার ও বলাৎকার ধর্ষণের সমতুল্য অপরাধ এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদ্রাসাগুলোতে যৌন নির্যাতন বন্ধ করতে হলে—
১. দেশের সকল আবাসিক ও অনাবাসিক মাদ্রাসাকে সরকারি নিবন্ধনের আওতায় আনা।
২. শিক্ষকদের কেন্দ্রীয় নিবন্ধন ও ধারাবাহিক ব্যাকগ্রাউন্ড চেক নিশ্চিত করা।
৩. হাইকোর্টের নির্দেশনানুযায়ী নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে প্রতিটি মাদ্রাসায় স্বাধীন यौन নিপীড়নবিরোধী সেল গঠন করা।
৪. আপস-সালিশের মাধ্যমে অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা আইনিভাবে কঠোর হস্তে দমন করা।
মন্তব্য