খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ই আগস্ট ২০২৬, ১১:২ এএম
দেশে দেখা দেওয়া তীব্র প্রাকৃতিক গ্যাস-সংকটের মারাত্মক প্রভাব এবার আঘাত হেনেছে খাদ্য ও নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী শিল্পখাতে। প্রয়োজনীয় গ্যাসের স্বাভাবিক চাপ না থাকায় নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) চিনি, গম, সয়াবিন বীজ মাড়াই ও ভোজ্যতেল প্রক্রিয়াজাতকরণের অন্তত ১২টি বড় কারখানা গত বুধবার থেকে একের পর এক পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু এমজিআই নয়, দেশের শীর্ষস্থানীয় অন্যান্য শিল্পগোষ্ঠীরও অধিকাংশ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গ্যাসের অভাবে অচল হয়ে পড়েছে। এতে করে সারা দেশে চাল, ডাল, আটা, ময়দা ও ভোজ্যতেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট ও দরবৃদ্ধির বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সদ্যবিদায়ী অর্থবছরে দেশজুড়ে চিনি, গম, ভোজ্যতেল ও ডালসহ সাতটি প্রধান নিত্যপণ্য ও কাঁচামাল আমদানি হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৫৪ লাখ টন। দৈনিক গড়ে ৪২ হাজার টনের বেশি পণ্য ও কাঁচামাল দেশে আসলেও সেগুলোর সিংহভাগই ছিল অপরিশোধিত বা অপ্রক্রিয়াজাত। এগুলো দেশের বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীর কারখানায় পরিশোধিত হওয়ার পর বাজারে যায়। এই আমদানিকৃত পণ্যের মধ্যে এককভাবে ২২ শতাংশই আনে এমজিআই। তাদের কারখানাগুলোতে দিনে প্রায় ৯ হাজার টন এবং বছরে প্রায় ৩৩ লাখ টন পণ্য প্রক্রিয়াজাত হয়। একই সঙ্গে শীর্ষ ৬টি শিল্পগোষ্ঠী গত অর্থবছরে মোট নিত্যপণ্যের ৬১ শতাংশ কাঁচামাল আমদানি করেছে। এসব প্রধান শিল্পগোষ্ঠীর কারখানা বন্ধ থাকায় এখন কাঁচামাল বন্দর ও গুদামে জমে থাকলেও বাজারে তৈরি পণ্যের সরবরাহ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের প্রকৃত চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু জাতীয় গ্রিডে স্বাভাবিক সময়েও সরবরাহ থাকে মাত্র ২৭০ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি, যার মধ্যে মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে আসত প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট। তবে গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটির কারণে একটি এলএনজি টার্মিনাল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, যা পরবর্তীতে ৬ আগস্ট আংশিক চালু হলেও গত ১২ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় অর্ধেক সক্ষমতায় চলেছে। ফলে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ কমে মাত্র ২০৩ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। চাহিদার তুলনায় বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে দিনে প্রায় ১৭৭ কোটি ঘনফুট। গ্যাসের এই নজিরবিহীন ঘাটতির কারণেই সারা দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে কারখানা সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
দেশজুড়ে প্রধান প্রধান শিল্পগোষ্ঠীগুলোর কারখানাগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি বেশ নাজুক। টি কে গ্রুপের মোট ২৮টি প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানার মধ্যে ২০টিই বর্তমানে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। সীকম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডেল্টা এগ্রোফুডের সয়াবিন ও ভোজ্যতেল প্রক্রিয়াজাতকরণের ৩টি কারখানা এবং স্মাইল ফুড প্রোডাক্টসের বড় ৩টি কারখানা প্রাঙ্গণেও গ্যাসের অভাবে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। সিটি গ্রুপের হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারখানাগুলোর উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে নাবিল গ্রুপ বিকল্প হিসেবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে কারখানা চালু রাখলেও তাদের উৎপাদন সক্ষমতা নেমে এসেছে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ শতাংশে। ফলে একদিকে তাদের উৎপাদন ব্যাপক কমেছে, অন্যদিকে তৈরি পণ্যের খরচ একলাফে অনেক বেড়ে গেছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে এমজিআইয়ের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল জানান, গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় বাধ্য হয়েই বুধবার থেকে সব নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার উৎপাদন স্থগিত রাখতে হয়েছে। বাজার দর ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে জরুরি ভিত্তিতে হলেও এসব সংবেদনশীল খাদ্য প্রস্তুতকারী কারখানায় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একই সুর টি কে গ্রুপের পরিচালক মুহাম্মদ মোস্তফা হায়দার ও সীকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হকের কণ্ঠেও। তাঁরা জানান, কারখানাগুলোতে প্রচুর কাঁচামাল মজুত রয়েছে, কিন্তু কেবল গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় চাকা ঘোরানো যাচ্ছে না।
বর্তমানে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো নিজেদের গুদামে আগে থেকে তৈরি করে রাখা বা প্রক্রিয়াজাত পণ্যের ওপর ভরসা করে বাজারে সরবরাহ ধরে রেখেছে। তবে ব্যবসায়ীরা সতর্ক করে বলছেন, গুদামের জমানো পণ্য দিয়ে সর্বোচ্চ দু-এক দিনের চাহিদা সামাল দেওয়া সম্ভব। এই সংকট দ্রুত সমাধান না হলে বাজারে বড় রকমের পণ্যঘাটতি দেখা দেবে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে পরামর্শ দিয়ে জানান, জাতীয়ভাবে গ্যাসের সংকট থাকলেও খাদ্য ও নিত্যপণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা সবচেয়ে বেশি জরুরি। সরকারের উচিত শিল্পখাতে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা। পাশাপাশি এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট ও দাম বৃদ্ধি করতে না পারে, সেজন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি কঠোর নজরদারি চালানো প্রয়োজন। একই সাথে গ্যাস সংকট নিরসনে সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে সঠিক তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা উচিত।
মন্তব্য