খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ই আগস্ট ২০২৬, ১১:৫৪ পিএম
রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরে যাঁর কণ্ঠে মিশে যায় মায়া, মমতা আর এক অনির্বচনীয় আবেশ—শ্রাবণী সেন দুই বাংলার সংগীতপ্রেমীদের কাছে তেমনই এক আপন নাম। আজ তাঁর জন্মদিন। এই বিশেষ দিনে কাঁটাতারের এপার থেকে প্রিয় শিল্পীর প্রতি রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা, ভালোবাসা ও অফুরান শুভকামনা।
শ্রাবণী সেন বর্ষীয়ান রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সুমিত্রা সেনের কন্যা এবং জনপ্রিয় গায়িকা ইন্দ্রাণী সেনের ছোট বোন। সংগীতের আবহেই তাঁর বেড়ে ওঠা। তবে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সংগীতের ঐতিহ্যকে অনুসরণ করেই থেমে থাকেননি তিনি; নিজের মেধা, সাধনা ও স্বকীয়তার মধ্য দিয়ে নির্মাণ করেছেন নিজের আলাদা শিল্পীসত্তা।
তিনি একাধারে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী, নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী, রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষিকা ও সাংবাদিক।
কলকাতার পাঠভবন বিদ্যালয়ের পাঠ শেষে তিনি গোখেল মেমোরিয়াল গার্লস কলেজ থেকে ভূগোলে সাম্মানিক স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। সংগীতজগতে পূর্ণভাবে আত্মনিয়োগের আগে কিছুদিন সাংবাদিকতাও করেছেন ‘মনোরমা’ পত্রিকায়। শৈশবে তবলা বাজানোর প্রতিও ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ।
গানের জগতে শ্রাবণী এসেছেন অপেক্ষাকৃত পরিণত বয়সে। তাঁর প্রথম ও প্রধান সংগীতগুরু ছিলেন মা সুমিত্রা সেন। পরবর্তীতে গীতবিতানে রবীন্দ্রসঙ্গীতের তালিম নেন। দীর্ঘ সাধনা, নিবিড় অনুশীলন এবং নিজস্ব সংগীতবোধ তাঁকে ধীরে ধীরে রবীন্দ্রসঙ্গীতের এক স্বতন্ত্র কণ্ঠে পরিণত করে।
দুই যুগেরও বেশি সময় আগে প্রকাশিত তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীতের অ্যালবাম ‘আমার একটি কথা’ ও ‘বন্ধু রহো সাথে’ শ্রোতামহলে ব্যাপক সাড়া জাগায়। এরপর একে একে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বহু একক অ্যালবাম। রবীন্দ্রনাথের গানকে তিনি শ্রোতাদের কাছে উপস্থাপন করেছেন একদিকে ঐতিহ্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখে, অন্যদিকে নিজস্ব সুরবোধ ও পরিবেশনভঙ্গির অভিনবত্বে।
এই নিজস্বতাই শ্রাবণী সেনকে করেছে আলাদা। তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত যেন একই সঙ্গে চেনা অথচ নতুন—যেখানে রবীন্দ্রনাথের চিরন্তন বাণীর সঙ্গে মিশে থাকে শিল্পীর নিজস্ব অনুভব ও হৃদয়ের অনুরণন।
রবীন্দ্রসঙ্গীতের পাশাপাশি নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবেও রয়েছে তাঁর উজ্জ্বল পরিচয়। চলচ্চিত্র পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘উৎসব’ ছবিতে ‘অমল ধবল পালে লেগেছে’ গানটি গেয়ে নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তাঁর চলচ্চিত্রযাত্রার সূচনা। এরপর ‘দেখা’, ‘বাড়িওয়ালি’, ‘স্বপ্নের ফেরিওয়ালা’, ‘সাঁঝবাতির রূপকথারা’, ‘বালিগঞ্জ কোর্ট’, ‘হেমন্তের পাখি’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি।
২০০০ সালে ‘উৎসব’ ছবিতে গান গাওয়ার জন্য বিএফজেএ-এর পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ মহিলা নেপথ্য কণ্ঠশিল্পীর পুরস্কার লাভ করেন শ্রাবণী সেন।
রবীন্দ্রসঙ্গীতের পাশাপাশি আধুনিক গানেও তাঁর কণ্ঠের স্বতন্ত্র পরিচয় রয়েছে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মঞ্চেও তিনি সংগীত পরিবেশন করেছেন। তাঁর গান ছুঁয়েছে দুই বাংলার পাশাপাশি প্রবাসী বাঙালির হৃদয়ও।
রবীন্দ্রসঙ্গীতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০১৯ সালে তাঁকে ‘বঙ্গভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করে। নিজের দীর্ঘ সংগীতজীবনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘শ্রাবণী সেন মিউজিক একাডেমি’—যার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীতের শিক্ষা ও চর্চাকে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াস অব্যাহত রেখেছেন।
শ্রাবণী সেন শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতের এক নিবেদিত সাধক। তাঁর কণ্ঠে যখন ভেসে আসে—
“তুমি কোন কাননের ফুল, কোন গগনের তারা…”
তখন মনে হয়, গান শুধু শোনা যায় না—গান অনুভব করা যায়, গান হৃদয়ের গোপন দরজায় কড়া নাড়ে।
কাঁটাতারের সীমারেখা মানুষের হৃদয়ের ভালোবাসাকে কখনো ভাগ করতে পারে না। তাই দুই বাংলার অসংখ্য সংগীতপ্রেমীর ভালোবাসায় আজও সমান উজ্জ্বল শ্রাবণী সেন।
আজ ১৪ আগস্ট, প্রিয় এই শিল্পীর জন্মদিনে কাঁটাতারের এপার থেকে জানাই শুভ জন্মদিনের নিখাদ শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।
আপনার কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান আরও বহু বছর বেঁচে থাকুক,
সুরের মায়ায় ভরে উঠুক অসংখ্য হৃদয়,
আপনার জীবন হোক আনন্দ, সুস্থতা, সৃষ্টিশীলতা ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ।
শুভ জন্মদিন প্রিয় শিল্পী শ্রাবণী সেন।
আপনার সুরের ভুবনে আমাদের পথচলা হোক আরও দীর্ঘ, আরও মুগ্ধতাময়।
অফুরান শুভকামনা ও শ্রদ্ধা
মন্তব্য