খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ই আগস্ট ২০২৬, ১১:৩৮ পিএম
বাংলাদেশের আধুনিক উপন্যাস নির্মাণকলার অন্যতম পথিকৃৎ, স্বতন্ত্র গদ্যভাষার অনন্য কারিগর এবং বাংলা কথাসাহিত্যের শক্তিমান শিল্পী রশীদ করিম। তাঁর সাহিত্যকর্মে যেমন ছিল গভীর জীবনবোধ, তেমনি ছিল সমাজ, সময়, মানুষ ও সম্পর্ককে দেখার এক নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। নির্মেদ, সাবলীল অথচ কাব্যিক দ্যোতনাময় গদ্যশৈলীর জন্য তিনি বাংলা সাহিত্যে নিজস্ব একটি আসন নির্মাণ করেছিলেন।
কবি শামসুর রাহমান রশীদ করিম সম্পর্কে যথার্থই বলেছিলেন—
«“রশীদ করিম আমাদের দেশের অন্যতম সেরা গদ্যকার। তাঁর ‘উত্তম পুরুষ’ উপন্যাসের ভাষা আশ্চর্য সহজ-সরল ও আধুনিক। রশীদ করিমকে আমি আমার সেরা বন্ধু মনে করি।”»
১৯২৫ সালের ১৪ আগস্ট কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন রশীদ করিম। কলকাতাতেই তাঁর শৈশব ও বেড়ে ওঠা। দেশভাগের পর কলকাতা ছেড়ে তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং একটি তেল কোম্পানিতে চাকরিতে যোগ দেন। কর্মজীবনের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চাকেই তিনি করে নেন তাঁর আত্মার অনিবার্য সাধনা।
তাঁর সাহিত্যজীবনের সূচনা ছোটগল্প দিয়ে। ১৯৪২ সালে ‘সওগাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর গল্প ‘আয়েশা’। একই সময়ে প্রকাশিত তাঁর ‘একটি মেয়ের আত্মকাহিনী’ গল্পটিও পাঠক ও সাহিত্যবোদ্ধাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু তাঁর এই গল্পের প্রশংসা করেছিলেন।
তবে রশীদ করিমের সাহিত্যিক পরিচয়কে সুদৃঢ় করে যে উপন্যাস, সেটি ‘উত্তম পুরুষ’। ভারতভাগের অস্থির সময়, দেশত্যাগ, মানুষের মানসিক টানাপোড়েন এবং পরিবর্তিত সমাজবাস্তবতার এক গভীর শিল্পিত দলিল এই উপন্যাস। ১৯৬১ সালে প্রকাশিত ‘উত্তম পুরুষ’ তাঁকে এনে দেয় আদমজী পুরস্কার এবং বাংলা কথাসাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত করে তাঁর স্বতন্ত্র মর্যাদা।
রশীদ করিমের উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে— ‘প্রসন্ন পাষাণ’, ‘আমার যত গ্লানি’, ‘প্রেম একটি লাল গোলাপ’, ‘সাধারণ লোকের কাহিনী’, ‘এ কালের রূপকথা’, ‘সোনার পাথরবাটি’, ‘বড়ই নিঃসঙ্গ’, ‘মায়ের কাছে যাচ্ছি’, ‘চিনি না’, ‘পদতলে রক্ত’ ও ‘লাঞ্চ বক্স’। তাঁর প্রকাশিত সর্বশেষ গ্রন্থ আত্মজীবনী ‘জীবনমরণ’।
উপন্যাসের পাশাপাশি ছোটগল্প ও প্রবন্ধ রচনাতেও তিনি রেখেছেন কৃতিত্বের স্বাক্ষর। তাঁর লেখায় ব্যক্তিগত জীবনাভিজ্ঞতা, সময়ের অভিঘাত, মানুষের অন্তর্গত দ্বন্দ্ব এবং সমাজবাস্তবতা মিশে তৈরি হয়েছে এক স্বতন্ত্র সাহিত্যভুবন। সহজ-সরল অথচ গভীর ব্যঞ্জনাময় ভাষা ছিল তাঁর গদ্যের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি অর্জন করেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার, রাষ্ট্রীয় একুশে পদক, লেখিকা সংঘ পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননা।
সাহিত্যিক খ্যাতির শিখরে থেকেও জীবনের শেষ পর্বটি তিনি কাটিয়েছেন অনেকটা নীরবে, লোকচক্ষুর আড়ালে। মৃত্যুর আগে দীর্ঘ প্রায় দুই দশক তিনি ছিলেন নিভৃতচারী। তাই তাঁর বিদায়ও এসেছিল অনেকটা নীরবেই।
২০১১ সালের ২৬ নভেম্বর ৮৬ বছর বয়সে এই শক্তিমান কথাশিল্পী শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
রশীদ করিম চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি চলে যায়নি। তাঁর উপন্যাসের চরিত্রগুলো, তাঁর নির্মেদ অথচ গভীর গদ্য, তাঁর সময়কে দেখার স্বতন্ত্র চোখ—সবকিছুই আজও বাংলা সাহিত্যের পাঠককে টেনে নেয় এক অনন্য জগতে।
তিনি ছিলেন সময়ের একজন নিবিড় পর্যবেক্ষক, মানুষের মনের এক সূক্ষ্ম পাঠক এবং বাংলা গদ্যের এক মেধাবী শিল্পী। রশীদ করিম তাই শুধু একজন ঔপন্যাসিক নন—তিনি বাংলা কথাসাহিত্যের এক স্বতন্ত্র অধ্যায়।
আজ তাঁর জন্মদিনে এই নিভৃতচারী কথাশিল্পীর স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।
তাঁর সাহিত্যকর্ম বেঁচে থাকুক পাঠকের হৃদয়ে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
মন্তব্য